২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা নামার পরই ফুটবল বিশ্বের দৃষ্টি এখন ২০৩০ বিশ্বকাপের দিকে। শতবর্ষের এই বিশ্বকাপকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন পরিকল্পনা। এবারের আসর ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, যেখানে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেয়। তবে দলসংখ্যা বাড়লেও ফুটবল ইতিহাসের বেশ কয়েকটি পরিচিত ও সফল দেশ জায়গা করে নিতে পারেনি। ফলে ২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে তারা।
ফিফা এমন ১০টি দেশের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, যাদের বিশ্বকাপে সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। তালিকায় রয়েছে- ইতালি, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, চিলি, পেরু ও কোস্টারিকা।
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যা দেশটির ফুটবল ইতিহাসে নজিরবিহীন। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে নরওয়ের পেছনে থেকে প্লে-অফে উঠলেও ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় জেন্নারো গাত্তুসোর দল। ফলে ২০১৪ সালের পর আর বিশ্বকাপের মূল পর্বে দেখা যায়নি আজ্জুরিদের।
ডেনমার্কও বিশ্বকাপে উঠার খুব কাছাকাছি গিয়েও ব্যর্থ হয়। স্কটল্যান্ডের কাছে শেষ ম্যাচে হেরে সরাসরি বিশ্বকাপে উঠার সুযোগ হারায় তারা। পরে প্লে-অফ ফাইনালে চেকিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়। তবে শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ স্কোয়াড ধরে রাখতে পারলে ২০৩০ সালে তাদের ফেরার সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে মনে করছে ফিফা।
পোল্যান্ড বিশ্বকাপে নয়বার অংশ নিয়ে দুবার তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে উঠতে পারেনি তারা। গ্রুপে নেদারল্যান্ডসের পেছনে থেকে প্লে-অফে উঠার পর সুইডেনের কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয়। ৩৮ বছরে পা দিতে যাওয়া রবার্ট লেভানদোভস্কির পরবর্তী সময়ের জন্য নতুন দল গড়াই এখন তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দুইবারের বিশ্বকাপ রানার্সআপ হাঙ্গেরি ১৯৮৬ সালের পর আর বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। এবারও শেষ ম্যাচে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে প্লে-অফের সুযোগ হাতছাড়া করে। তবে টানা তিনটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের নতুন করে আশা জোগাচ্ছে।
রোমানিয়া সাতবার বিশ্বকাপে খেলেছে। ১৯৯৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা তাদের সেরা সাফল্য। এবার নেশন্স লিগের সুবাদে প্লে-অফে সুযোগ পেলেও সেমিফাইনালে তুরস্কের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপের স্বপ্ন ভেঙে যায়। কিংবদন্তি গিওর্গে হাজির অধীনে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছে রোমানিয়ানরা।
আফ্রিকার অন্যতম সফল দল নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুনও টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে অনুপস্থিত। নাইজেরিয়া প্লে-অফে কঙ্গো ডিআরের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বাদ পড়ে। অন্যদিকে ক্যামেরুন বাছাইপর্বে কেপভার্দের পেছনে থেকে প্লে-অফে ওঠে, কিন্তু সেখানেও কঙ্গো ডিআরের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায়। প্রতিভার অভাব না থাকলেও স্থায়ী পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতার ঘাটতিকেই দুদলের বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে ফিফা।
দক্ষিণ আমেরিকার চিলি টানা তিনটি বিশ্বকাপ মিস করেছে। ২০২৬ বাছাইপর্বে ১৮ ম্যাচে মাত্র দুটি জয় নিয়ে সবার নিচে থেকে শেষ করে তারা। একসময় আলেক্সিস সানচেজ, আর্তুরো ভিদাল ও ক্লদিও ব্রাভোদের নেতৃত্বে দুর্দান্ত সময় কাটানো দলটি এখন নতুন প্রজন্মের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়াতে চায়।
অন্যদিকে পেরু বাছাইপর্বে ১৮ ম্যাচে মাত্র দুটি জয় ও ছয় গোল করে নবম স্থানে থেকে বিশ্বকাপের আশা হারায়। তাই আক্রমণভাগে নতুন খেলোয়াড় গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজেদের রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা ধরে রাখাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। কোস্টারিকাও ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা পায়নি।
শেষ পর্বের বাছাইয়ে হন্ডুরাসের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র তাদের আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের সুযোগও কেড়ে নেয়। অথচ ২০১৪ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে সবাইকে চমকে দিয়েছিল মধ্য আমেরিকার দেশটি। সেই সাফল্যের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতেই এখন নতুন দল গঠনের কাজে নেমেছে তারা।
বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপনের আসর হিসেবে ২০৩০ বিশ্বকাপকে ঘিরে বাড়তি আবেগ কাজ করছে ফুটবলবিশ্বে। তাই ইতিহাস সমৃদ্ধ এই দেশগুলোর জন্য এটি শুধু আরেকটি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার লড়াই নয়, বরং হারানো ঐতিহ্য, সম্মান ও গৌরব পুনরুদ্ধারেরও এক সুবর্ণ সুযোগ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও