ফুটবল এখন আর কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়। গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ডের বাইরেও আজকের ফুটবল ঘিরে তৈরি হয় অসংখ্য গল্প; কখনো আবেগের, কখনো ফ্যাশনের, কখনো আবার ভালোবাসার। বিশ্বকাপের আলোয় যেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন মাঠের নায়কেরা, তেমনি আলোচনায় চলে আসেন তাদের জীবনের বিশেষ মানুষরাও।
স্পেন জাতীয় দলের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল যখন বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চে নামার অপেক্ষায়, তখন গ্যালারিতেও থাকবে আরেকটি পরিচিত মুখ। তিনি ইনেস গার্সিয়া সান্তোস, স্পেনের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, যিনি এখন ইয়ামালের সবচেয়ে বড় সমর্থক।
তাদের গল্পের শুরু অবশ্য কোনো সিনেমার মতো নয়। ছিল না রাজকীয় কোনো পার্টি কিংবা আকস্মিক প্রথম দেখার রোমান্টিক মুহূর্ত। এই ভালোবাসার জন্ম হয়েছিল আধুনিক সময়ের সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
সম্প্রতি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল করার পর স্পোর্টস প্ল্যাটফর্ম ‘ডেজোন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন ইয়ামাল।
তিনি বলেন, এই গোলটি আমি আমার মা, আমার প্রেমিকা, আমার বন্ধুদের এবং মাতারোতে থাকা সবাইকে উৎসর্গ করছি।
এই একটি বাক্যই যেন কয়েক মাসের সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটায়।
২১ বছর বয়সী ইনেস গার্সিয়া স্পেনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত একটি মুখ। অন্যদিকে ইয়ামাল মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম। তবে পরিচয়ের গল্পটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে।
চলতি বছরের শুরুতে গ্রিসে একসঙ্গে ছুটি কাটানোর কিছু ছবি প্রকাশ পাওয়ার পর প্রথমবারের মতো তাদের সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এরপর মে মাসে এফসি বার্সেলোনার একটি নৈশভোজে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে একসঙ্গে দেখা যায় এই জুটিকে।
তবে ইনেসের দাবি, মানুষের ধারণার চেয়ে তাদের পরিচয় অনেক পুরোনো।
তিনি বলেন, মানুষ আমাদের একসঙ্গে দেখতে শুরু করে যখন আমরা গ্রিসে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি লামিনকে তারও অনেক আগে থেকে চিনি। তিন বছর না হলেও, মানুষ যতটা ভাবছে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে আমাদের পরিচয়।
ইনেস জানান, তারা সম্পর্ককে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে নেননি। বরং একে অপরকে জানার জন্য সময় নিয়েছেন। আমরা সম্পর্ককে সময় দিয়েছি। সামনাসামনি দেখা করার আগে দীর্ঘ সময় ধরে আমরা কথা বলেছি।
আর তাদের প্রথম পরিচয় কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তরে ইনেস হাস্যরসের সঙ্গেই বলেন, আপনারা হয়তো কোনো নিখুঁত বা সিনেমার মতো প্রেমের গল্প আশা করছেন। কিন্তু সত্যিটা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম!
সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিশ্বকাপে স্পেনের প্রতিটি ম্যাচে গ্যালারিতে নিয়মিত দেখা গেছে ইনেসকে। প্রায় প্রতিবারই তিনি ইয়ামালের জার্সি পরে উপস্থিত থেকেছেন, গ্যালারি থেকে উৎসাহ দিয়েছেন স্পেনের তরুণ তারকাকে।
ইনেস নিজেকে পপ তারকা জাস্টিন বিবারের বড় ভক্ত বলেও পরিচয় দেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের হাফটাইমে বিবারের পারফরম্যান্সের ঘোষণা আসার পর তিনি নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে স্প্যানিশ ভাষায় ইয়ামালকে উদ্দেশ করে লেখেন, প্রিয়, ফাইনালে ওঠার জন্য যা যা দরকার সবই করো। শুনছ তো? যা লাগে করো।
ফুটবলের বাইরে এই জুটিকে বার্সেলোনায় সংগীতশিল্পী ব্যাড বানির একটি কনসার্টেও একসঙ্গে দেখা গেছে।
যদিও ইনেস গার্সিয়া সম্পর্কে অনলাইনে খুব বেশি ব্যক্তিগত তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তার ইনস্টাগ্রাম বায়োতে তিনি নিজেকে স্পেনের সেভিলের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
ফরাসি সাময়িকী ‘ওম্যান মাদাম ফিগারো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত একটি মজার দিকও তুলে ধরেন ইনেস। তিনি বলেন, আমি ভ্রমণ করতে খুব ভালোবাসি, কিন্তু উড়োজাহাজে চড়তে ভীষণ ভয় পাই। দুটি বিষয় আসলে একসঙ্গে যায় না। তবে ধীরে ধীরে সেই ভয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। এই গ্রীষ্মে স্পেন ও দেশের বাইরে কয়েকটি ভ্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা সবাই দেখতে পাবেন।
বিশ্বকাপের ফাইনালের আলোয় আজ লামিন ইয়ামাল যেমন কোটি মানুষের নজরের কেন্দ্রে, তেমনি গ্যালারির একটি আসনে বসে থাকা ইনেস গার্সিয়াও হয়ে উঠেছেন আলোচনার অংশ। তবে তিনি শুধু একজন ফুটবলারের প্রেমিকা নন; নিজের পরিচয়, কাজ এবং স্বকীয়তা দিয়েও তিনি আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন।
হয়তো এটাই আধুনিক সময়ের ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা। যেখানে সম্পর্কের শুরু হয় একটি বার্তা থেকে, বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে একটি চ্যাটবক্সে, আর একসময় সেই গল্প পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের গ্যালারিতে। লামিন ইয়ামাল ও ইনেস গার্সিয়ার গল্পটাও ঠিক তেমনই-ডিজিটাল যুগের এক নিঃশব্দ, স্বাভাবিক, অথচ সুন্দর প্রেমের গল্প।
সময়ের আলো/আরবিএন