ফুটবলের কিছু লড়াই আছে, যার বাঁশি বাজে মাঠে, কিন্তু শুরুটা হয় ইতিহাসের পাতায়। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের দ্বৈরথ ঠিক তেমনই। এই লড়াইয়ে গোলের হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধের স্মৃতি, জাতীয় অহংকার, রাজনৈতিক বৈরিতা আর কোটি মানুষের আবেগ।
১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল। দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ড। আর্জেন্টিনার কাছে মালভিনাস। হঠাৎ করেই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। সেদিন আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা দ্বীপপুঞ্জটি দখল করে নিলে পাল্টা জবাব দেন যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার।
দক্ষিণ আটলান্টিকে পাঠানো হয় শক্তিশালী নৌবহর, শুরু হয় ৭৪ দিনের রক্তক্ষয়ী ফকল্যান্ড যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে প্রাণ হারান ৯০০-এর বেশি মানুষ; নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা। যুদ্ধ শেষ হলেও দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে তৈরি হওয়া ক্ষত আর কখনো পুরোপুরি শুকায়নি।
চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে সেই ইতিহাস যেন নতুন রূপে ফিরে আসে। দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং মাত্র চার মিনিট পর পাঁচজন ইংলিশ ফুটবলারকে কাটিয়ে করা অবিশ্বাস্য ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ শুধু আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে তোলেনি; বহু আর্জেন্টাইন সমর্থকের কাছে সেটি ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষতের প্রতীকী জবাব। সেই ম্যাচের পর থেকেই আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ শুধুই ফুটবলের লড়াই নয়; এটি ইতিহাস, জাতীয় গর্ব ও আবেগের প্রতীকে পরিণত হয়।
চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক। তবু ফুটবলের এই বৈরিতার উত্তাপ আজও কমেনি। নিরপেক্ষতা ও সম্ভাব্য বিতর্ক এড়াতে ফিফা ও রেফারিং কর্তৃপক্ষ সাধারণত আর্জেন্টিনার ম্যাচে ইংল্যান্ডের রেফারি এবং ইংল্যান্ডের ম্যাচে আর্জেন্টিনার রেফারিকে দায়িত্ব দেন না। দুই দেশের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই এই অলিখিত নীতি দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা হচ্ছে।
এবার সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। ফাইনালের টিকেটের লড়াইয়ে মুখোমুখি ফুটবলের দুই পরাশক্তি। তবে এবার গল্পে রয়েছে নতুন এক আকর্ষণ। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই প্রথম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের স্বাক্ষর রাখার সুযোগ অপেক্ষা করছে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের সামনে।
সেমিফাইনালে ওঠার পথটাও ছিল দুই দলের জন্য ভিন্ন স্বাদের। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই খেলেছে আত্মবিশ্বাসী ও নিয়ন্ত্রিত ফুটবল। লিওনেল স্কালোনির দল গ্রুপ পর্বে আধিপত্য দেখিয়ে নকআউটে পৌঁছায়। শেষ-বত্রিশ কেপভার্দে ও শেষ ষোলোতে মিসরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে আলবিসেলেস্তেরা।
নির্ধারিত সময়ে সমতা থাকলেও অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালের টিকেট নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টজুড়েই মেসির নেতৃত্ব, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সৃজনশীলতা, এনজো ফার্নান্দেজের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো-লিসান্দ্রো মার্তিনেজ জুটির দৃঢ়তা দলটিকে করেছে ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিণত।
অন্যদিকে থমাস টুখেলের অধীনে নতুন চেহারায় দেখা যাচ্ছে ইংল্যান্ডকে। আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক, সংগঠিত এবং কৌশলগতভাবে নমনীয় ফুটবল খেলছে থ্রি লায়ন্স। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পর নকআউটেও আত্মবিশ্বাস ধরে রেখেছে তারা।
শেষ ষোলোতে ঐতিহাসিক আজতেকায় স্বাগতিক মেক্সিকোকে ও কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে টুখেলের দল। অধিনায়ক হ্যারি কেইনের গোল করার সহজাত ক্ষমতা, জুড বেলিংহামের সর্বাঙ্গীণ নৈপুণ্য, বুকায়ো সাকার গতি, ফিল ফোডেনের সৃজনশীলতা এবং ডেকলান রাইসের নেতৃত্বে মাঝমাঠের দৃঢ়তা ইংল্যান্ডকে করেছে এবারের আসরের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল।
এই ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হতে পারে মাঝমাঠের লড়াইয়ে। একদিকে এনজো ফার্নান্দেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, অন্যদিকে ডেকলান রাইস ও জুড বেলিংহাম। চারজনের এই বুদ্ধি, শক্তি ও কৌশলের দ্বৈরথ ম্যাচের ছন্দ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মেসিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, আর আর্জেন্টিনার লক্ষ্য থাকবে হ্যারি কেইনকে গোলের সুযোগ থেকে দূরে রাখা।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড লড়াইয়ের ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। ১৯৬৬ সালের বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনাল, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার জাদু, ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড আর টাইব্রেকারের নাটক, ২০০২ সালে ডেভিড বেকহামের পেনাল্টিতে ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ। প্রতিবারই এই দ্বৈরথ জন্ম দিয়েছে নতুন গল্প। এবার সেই ইতিহাসে যোগ হতে যাচ্ছে আরেকটি অধ্যায়।
একদিকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর আবারও বিশ্বসেরার মুকুট জয়ের অপেক্ষায় ইংল্যান্ড। একদিকে ম্যারাডোনার স্মৃতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে অতীতের সব আক্ষেপ মুছে নতুন ইতিহাস লেখার প্রত্যয়।
তাই এই মহারণ শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়; এটি ইতিহাস ও বর্তমানের মুখোমুখি দাঁড়ানো, যুদ্ধের ক্ষত থেকে জন্ম নেওয়া এক চিরন্তন ফুটবল-প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়। ৯০ মিনিট শেষে একটি দল নিশ্চিত করবে ফাইনাল, কিন্তু ফল যাই হোক না কেন, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ আবারও মনে করিয়ে দেবে, কিছু ম্যাচ কেবল খেলা নয়, ইতিহাসেরই আরেকটি পুনর্লিখন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি