উসমান দেম্বেলে যে বিশ্বমঞ্চে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারেন, নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তা আরও একবার হাড়ে হাড়ে টের পেল ফুটবল দুনিয়া। সর্বশেষ ব্যালন ডি’অরজয়ী এই ফরাসি ফরোয়ার্ডের বিশ্বকাপ শুরুর আগের মূল পরিচয়টা যখন মেসি, এমবাপ্পে আর হালান্ডদের গোলের বন্যায় সবাই প্রায় ভুলতেই বসেছিল, তখনই স্বরূপে ফিরলেন তিনি। বড় টুর্নামেন্টগুলোতে সাধারণত দেম্বেলেকে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন অপবাদ ঘোচাতেই যেন বোস্টনে নরওয়ের রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে এক অনবদ্য 'মাস্টারপিস' আঁকলেন এই ফরাসি তারকা।
গ্রুপ পর্বে ইরাক ম্যাচের আগে বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১৯টি ম্যাচে কোনো গোলের দেখা পাননি দেম্বেলে। ফ্রান্সের জার্সিতে তার এই দীর্ঘ খরা কেটেছিল ইরাকের বিপক্ষে এক গোল দিয়ে। কিন্তু সেই এক ফোঁটা বৃষ্টি যে পরবর্তীতে নরওয়ের বিপক্ষে গোল-প্লাবনের পূর্বাভাস ছিল, তা কজনই বা জানত! ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি হয়তো আগেই টের পেয়েছিলেন দেম্বেলের গতি, ড্রিবলিং আর সব্যসাচী পায়ের কার্যকারিতা। নরওয়ের বিপক্ষে মাত্র ৩২ মিনিটে দেম্বেলের হ্যাটট্রিক দেখে মুগ্ধ অঁরি বলেই ফেললেন, ‘গ্রেট খেলোয়াড়েরা মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকেন না, তারা মুহূর্ত তৈরি করেন।’ মাঠে দেম্বেলের বিমূর্ত দৌড়ের ‘হিট-ম্যাপ’ দেখে ধারাভাষ্যকাররাও এটিকে তুলনা করেছেন কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী জ্যাকসন পোলকের মাস্টার আর্টওয়ার্কের সাথে।

ম্যাচে দেম্বেলের করা প্রতিটি গোলের ধরণই অবশ্য ফুটবলপ্রেমীদের বেশ চেনা, যা অতীতে বার্সেলোনা কিংবা বর্তমান পিএসজির হয়ে তিনি প্রায়ই করে থাকেন। ম্যাচের ৭ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পের চমৎকার পাস থেকে বক্সের ভেতর বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে প্রথম গোলটি করেন তিনি, যা ছিল একজন জাত স্ট্রাইকারের ‘ট্রেডমার্ক’। এর ১৩ মিনিট পর আবারও সেই এমবাপ্পের আড়াআড়ি পাস থেকে বাঁ প্রান্ত দিয়ে কাট-ইন করে বক্সের বাইরে থেকে বাঁকানো শটে দ্বিতীয় গোলটি তুলে নেন এই উইঙ্গার। আর ৩২তম মিনিটে বক্সের ভেতর প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। দেম্বেলের এই গোল করার ধরণ লিওনেল মেসি কিংবা আরিয়েন রবেনের সোনালী দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলেও, এই লাইসেন্স যে তার নিজেরও আছে তা তিনি প্রমাণ করলেন। যেখানে পুরো ম্যাচটিকে দেখা হচ্ছিল এমবাপ্পে ও হালান্ডের দ্বৈরথ হিসেবে, সেখানে দেম্বেলে এসে সব আলো কেড়ে নিলেন। ডান পায়ে এমবাপ্পে শক্তিশালী হলেও দেম্বেলের শক্তির জায়গা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে, এমনকি গুঞ্জন আছে তিনি নিজেও তা জানেন না! তবে রাইট উইংয়ে খেলার সুবাদে নিজের সেই চিরচেনা ‘বাঁ পায়েই’ আজ বিশ্বকাপের নতুন ইতিহাস লিখলেন তিনি।
ম্যাচের শুরু থেকে হিসাব করলে ৩২ মিনিটে করা দেম্বেলের এই হ্যাটট্রিকটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম। এর আগে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ২৪ মিনিটে হ্যাটট্রিক করেছিলেন অস্ট্রিয়ার এরিক প্রবস্ট, যার ফলে দেম্বেলের এই কীর্তি গত ৭২ বছরের মধ্যে বিশ্বমঞ্চে দ্রুততম প্রথমার্ধের হ্যাটট্রিক। অবশ্য ম্যাচে যেকোনো সময় বদলি নেমে কম সময়ে (৭ মিনিট ৪২ সেকেন্ড) দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ডটি ১৯৮২ বিশ্বকাপে এল সালভাদরের বিপক্ষে করেছিলেন হাঙ্গেরির লাসলো কিস।

রেকর্ড নিয়ে অবশ্য দেম্বেলের নিজের কোনো মাথাব্যথা নেই। ম্যাচ শেষে তার সরল স্বীকারোক্তি, ‘ভালো লাগছে, এটি বিশেষ মুহূর্ত। তবে ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে নিজের পারফরম্যান্স ও দলের ওপর প্রভাবই আমার বেশি পছন্দ ছিল।’ তবে রেকর্ড বই বলছে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে ওলেগ সালেঙ্কো একাই ৫ গোল করার ম্যাচে প্রথমার্ধে হ্যাটট্রিক করেছিলেন। ঠিক ৩২ বছর পর ওলেগের সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করে বিশ্বকাপের প্রথমার্ধে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করলেন দেম্বেলে। একই সাথে ইউসেবিও (১৯৬৬), রুমেনিগে (১৯৮২) এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর (২০১৮) পর ইতিহাসের চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার তালিকায় নাম লেখালেন তিনি।

উইঙ্গার, স্ট্রাইকার আর মিডফিল্ডারের এক অপূর্ব মিশ্রণে নরওয়ের বিপক্ষে এদিন আবির্ভূত হয়েছিলেন আসল দেম্বেলে। আর তার এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে সবচেয়ে বেশি উছ্বসিত ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি গোল উদযাপনে দেম্বেলেকে দু-দুবার কোলে তুলে নেন। এই ম্যাচে রয়টার্সের ক্যামেরায় ধরা পড়া এমবাপ্পের কোলে দেম্বেলের সেই ছবি যেন ফরাসি ফুটবলের নতুন বন্ধুত্বের প্রতীক। গ্রুপ পর্ব শেষে এমবাপ্পে ও দেম্বেলে উভয়েরই ঝুলিতে এখন সমান ৪টি করে গোল। দেম্বেলে ও এমবাপ্পের এই বিধ্বংসী রূপ দেখে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ দলের ডিফেন্ডারদের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড়। থিয়েরি অঁরিও প্রতিপক্ষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘পরের ম্যাচে ডিফেন্ডার হিসেবে দেম্বেলের মুখোমুখি হতে হলে আমি খুব দুশ্চিন্তায় ভুগতাম।’ কেননা রক্ষণব্যূহ ভাঙা কিংবা গোল করা—উভয় ক্ষেত্রেই এই দেম্বেলে যে মাঝে মাঝে এমবাপ্পের চেয়েও ঢের বেশি ধারালো!
সময়ের আলো/আরবিএন