
মানুষকে বলা হয় সবাক প্রাণী। মানুষ তার পরিচয় ও প্রজ্ঞা প্রকাশ করে জিহ্বার মাধ্যমে। যে জিহ্বা সংযত রাখতে পারে, সে সফলকাম হয়। আর যে এর নিয়ন্ত্রণ হারায় সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জিহ্বা মানুষকে ধ্বংসের অতলে ডুবাইতে পারে, আবার সাফল্যের শীর্ষেও সমাসীন করতে পারে। কটু কথা, গিবত, পরনিন্দা, গাল-মন্দ, মিথ্যা বলা ইত্যাদি অপরাধ জিহ্বা দ্বারা সংঘটিত হয়।
তাই পরকালে মুসলিম জাতির জান্নাত ও জাহান্নাম জিহ্বার ওপরই নির্ভর করবে। যার জিহ্বা সঠিকভাবে পরিচালিত হবে, সে জান্নাতে যাবে। যার জিহ্বা ভুল পথে পরিচালিত হবে, সে হবে জাহান্নামি। পার্থিব জীবনে জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কাছে এই অঙ্গীকার করবে যে, সে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত জিহ্বা এবং তার দুই পায়ের মধ্যস্থিত বস্তুর জিম্মাদার হবে, তবে আমি তার জন্য বেহেশতের জিম্মাদার হব।’ (বুখারি : ৬৫৫২)
জিহ্বার সংযমে মুক্তি
জিহ্বার সংযমে মানব জাতির সুখ-শান্তি ও মুক্তি নিহিত। পরকালে জান্নাত লাভ করতে হলে মুমিনদের অবশ্যই জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। স্বীয় জিহ্বাকে নিষ্প্রয়োজন, কটু ও মিথ্যা বলা থেকে বিরত রাখতে হবে। প্রবৃত্তির লোভ-লালসার কুবাসনা প্রকাশে জিহ্বাকে কখনো ব্যবহার করবে না।
মুমিনরা যদি জিহ্বাকে সত্য ও ন্যায় বলার জন্য ব্যবহার করে তা হলে তারা পরকালে জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব থেকে মুক্তি পাবে। পার্থিব জগতে জিহ্বার সঠিক ব্যবহার করা হলে তখন জিহ্বা পরকালে মুমিনকে জান্নাত উপহার দেবে, অন্যথায় দোজখের দিকে ঠেলে দেবে। এটাই হলো জিহ্বার অদৃশ্য ক্ষমতা। এ ক্ষমতার সঠিক ব্যবহারে মুসলিম উম্মাহর মুক্তি মিলবে।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, মুক্তির উপায় কী? তিনি বললেন, নিজের জিহ্বাকে আয়ত্তে রাখো, নিজের ঘরে পড়ে থাকো এবং নিজের পাপের জন্য কান্নাকাটি করো।’ (তিরমিজি : ২৫৮৬)
জিহ্বার প্রতি অন্যান্য অঙ্গের ফরিয়াদ
শরীরের অঙ্গগুলো অন্তরের আনুগত্য করে এবং সব অঙ্গ অন্তরের অধীনে পরিচালিত হয়। আর জিহ্বা যেহেতু মানবান্তরের মুখপাত্র সেহেতু অঙ্গগুলোর কার্যক্রম তার সঙ্গে সংযোজিত। এ জন্য মানুষের জিহ্বা সঠিকভাবে পরিচালিত হলে তখন তাদের অঙ্গগুলোর কার্যক্রমও সঠিক বলে বিবেচিত হবে, আর জিহ্বা ভুল পথে পরিচালিত হলে তখন অঙ্গগুলোর কার্যকলাপ ভুল হিসেবে বিবেচ্য হবে। সুতরাং, মানবদেহের জিহ্বা ঠিক থাকলে দেহের অঙ্গগুলো ঠিক থাকবে আর জিহ্বা বাঁকা হলে অঙ্গগুলোও বাঁকা হয়ে পড়বে। জিহ্বার ব্যবহারই প্রমাণ করবে ব্যক্তিসত্তা সৎ নাকি অসৎ। যে ব্যক্তি জিহ্বা দ্বারা সত্য ও ন্যায়ের কথা বলবে সে ইহ-পরকালে সফলকাম হবে, অন্যথায় উভয় জগতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই দেহের অঙ্গগুলো প্রতিদিন ভোরে জিহ্বার সঠিক ব্যবহারের জন্য ফরিয়াদ করে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন আদম সন্তান ভোরে উঠে তখন তার অঙ্গগুলো জিহ্বাকে বিনয়ের সঙ্গে বলে, আমাদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, আমরা সবাই তোমার সঙ্গে জড়িত। সুতরাং, তুমি ঠিক থাকলে আমরাও ঠিকথাকব। আর তুমি বাঁকা হলে আমরাও বাঁকা হয়ে পড়ব।’ (তিরমিজি : ২৫৮৭)
জিহ্বা ধ্বংসকারী বস্তু
জিহ্বা মানবদেহের একটি শক্তিধর যন্ত্র। এটি অখাদ্যকে আটকে দেয় এবং তা গলাধঃকরণ করতে দেয় না। সুস্পষ্ট কথা বলার মাধ্যম হলো জিহ্বা। জিহ্বাহীন ব্যক্তি বোবার মতোই। খাবারের স্বাদ নির্ণয় করা হয় এ ক্ষুদ্র জিহ্বা দ্বারা। জিহ্বা আল্লাহ প্রদত্ত অনন্য নেয়ামত। কিন্তু এ নেয়ামতের সদ্ব্যবহার করা না হলে তখন মানুষ নিজের জীবনে কালিমা লেপন করতে হয়। জিহ্বার অসৎ ব্যবহারে স্বীয় জীবনে ধ্বংস নেমে আসে। জিহ্বার অসংযতের কারণে লাঞ্ছনা শিকার হতে হয়। হাদিসে আছে, হজরত সুফিয়ান ইবনে আবদুল্লাহ সাকাফি (রা.) বলেন, একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমার জন্য যেই জিনিসগুলো ভয়ের কারণ বলে আপনি মনে করেন তন্মধ্যে সর্বাধিক ভয়ংকর কোনটি? বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি নিজের জিহ্বা ধরলেন এবং বললেন, এটা। (তিরমিজি : ২৫৯২)
অন্য হাদিসে আছে, আসলাম (রা.) বলেন, এক দিন হজরত ওমর (রা.) হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর কাছে গেলেন, তখন তিনি স্বীয় জিহ্বা টানছিলেন, হজরত ওমর বললেন, থামুন! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুক! ব্যাপার কী? তখন হজরত আবু বকর (রা.) বললেন, এটাই আমাকে ধ্বংসের স্থানগুলোতে অবতীর্ণ করেছে (মুয়াত্তা মালেক : ১৮২৫)। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নিজের জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। ভালো কথাই কেবল বলতে হবে। মন্দ কথা পরিহার করে চুপ থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
সময়ের আলো/আরএস/