সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, রাষ্ট্র আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে এসেছি। রাষ্ট্রের কল্যাণে শাবিপ্রবির উন্নয়নে আমার উপর অর্পিত দায়িত্বগুলো আমি যথাযথ পালন করে যাবো।
উপাচার্যের প্রথম মেয়াদ শেষ করে দ্বিতীয় মেয়াদে যোগদানের প্রথম বছর অতিবাহিত উপলক্ষে দৈনিক সময়ের আলোকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, উপাচার্য হিসেবে আমি আমার প্রথম মেয়াদের দায়িত্বকালকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর যত সমস্যা দেখেছি সবচাইতে বেশি পীড়া দিয়েছে সেশন জ্যাম। এ সমস্যা করোনার আগে কমে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে জবাবদিহির জায়গা শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিষয় নজর দেওয়া বাদ পড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, জার্নাল প্রকাশে যে পরিমাণ ধীরগতি ছিল, তা আর এখন নেই। প্রতিবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ছয় মাস অন্তর জার্নাল নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।
বর্তমানে দুইটি বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে উপাচার্য জানান যে , প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও অনেক বেশি উন্নত ও সম্প্রসারিত করা। দ্বিতীয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের গুণগত মান বজায় রাখা। অবকাঠামোতে পরিবর্তনের বিষয়টাকেই আসলে আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, এর মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন। আমাদের গবেষণার সুফল যাতে দেশ ও বিশ্বের সর্বপ্রকার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে কাজ করতে সক্ষম হয় এর বাস্তবায়ন আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য । তাছাড়া, র্যাংকিং এ উচ্চতর ও সুনিশ্চিত অবস্থানে পৌঁছানোও এই মুহূর্তে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই প্রয়াসে আমরা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছি।
করোনা মহামারীতে দেশের মানুষের বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের মানুষদের সেবার কথা জানিয়ে উপাচার্য বলেন, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ২টি আরটি-পিসিআর মেশিনের মাধ্যমে অত্যাধুনিক কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এরইমধ্যে প্রায় ১ লক্ষরেও অধিক নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। করোনা শনাক্তকরণ ছাড়াও ল্যাবের গবেষক দল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রের অর্থায়নে কোভিড-১৯-এর ভাইরাস নিয়ে গবেষণা কাজ অব্যাহত রেখেছে। গবেষক দলটি ইতোমধ্যে সিলেট বিভাগের চার জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করে জিন বিন্যাস (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করেন। উন্মোচিত জিন বিন্যাস থেকে ৪৯টি নমুনার জিন বিন্যাস গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটাবেজে (জিআইএসএআইডি) জমা দেন, যা ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়।
গবেষণার বরাদ্দ নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা জার্নালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বছর ৭০০ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এ অর্জন একটি ধারাবাহিক কর্মতৎপরতার ফসল। গবেষণা বাজেট ইতোমধ্যে ৮ কোটি টাকায় উন্নিত করা হয়েছে , যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে আমরাই গবেষণা খাতে বাজেটের ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখছি। গবেষণাকে তথ্যবহুল করার জন্য আমরা রিমোট এক্সেস লাইসেন্স নিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে বিনামূল্যে ইউনিভার্সিটির ডিজিটাল লাইব্রেরির সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এখন শুধু প্রয়োজন গবষেণা মান বজায় রেখে নিরলস গবেষণা করা।
অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে উপাচার্য জানান, শাবিপ্রবিতে চলছে দুইটি অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। বর্তমানে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত ২০০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার কাজসমূহ দৃশ্যমান। প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮৬ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে যা মোট প্রকল্পের ৪৩শতাংশ অগ্রগতি। এছাড়াও ২০১৯ সালের ৯জুলাই ৯৮৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকার আরেকটি বড় একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। আমাদের সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, চলতি বছরেই কাজগুলো পুরোদমে শুরু হবে।
দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা শাবিপ্রবিতে বিদ্যমান জানিয়ে উপাচার্য বলেন, আমরা সবকিছুতেই এগিয়ে আছি। সরকার আমাদেরকে বিভিন্নভাবে অনেক বিষয়ে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। আমাদের উচিৎ এই সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেশকে আরও ভালো কিছু দেওয়া।
তিনি আরও বলেন, শাবিপ্রবির প্রতি সরকারের আলাদা নজর আছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সকল খবরই সরকারের নজরে। সামনের সময়গুলোতে এই বিশ্ববিদ্যালয় আরও বেশি শিক্ষার্থীবান্ধব ও গবেষণা নির্ভর করাই হবে পরবর্তী সময়গুলোর মূল দায়িত্ব।
২০১৭ সালের ২১ আগস্ট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১তম উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বের ২০২১ সালের জুন মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাকে পুনরায় দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ প্রদান করা হয় এবং পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২১ আগস্ট তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে যোগদান করেন। উপাচার্যের দায়িত্বগ্রহণের আগে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ একাধারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্বসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
/ডিএফ