টঙ্গী পূর্ব থানায় কর্মরত পুলিশের এএসআই পারভেজ মল্লিক যাত্রাবাড়ী যাচ্ছিলেন বলাকা পরিবহনের একটি বাসে। সেখান থেকে চাঁদপুরের মতলবে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পথে বনানী এলাকায় একজন বই বিক্রেতা বাসে ওঠেন। এরপর তার পাশে দাঁড়িয়ে বই বিক্রির নানা চটকদার কথা বলতে থাকেন। এ সময় পারভেজকে অনেকটা আন্তরিকতার সঙ্গে একটি বই দেখতে দেওয়া হয়। এর কিছু সময়ের মধ্যেই চোখ বুজে আসে পারভেজের। যখন জ্ঞান ফিরে তখন তিনি নিজেকে দেখেন রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে।
সুস্থ হওয়ার পর গত ৫ অক্টোবরের ওই ঘটনা সম্পর্কে পারভেজ সময়ের আলোকে জানান, ওই বইয়ের পাতায় যেকোনো ধরনের চেতনানাশক দিয়ে তাকে অজ্ঞান করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা তার পকেটে থাকা নগদ বেশকিছু টাকা হাতিয়ে নিয়ে চলে যায়। এভাবেই টার্গেট করা যেকোনো যাত্রী-চালক কিংবা পথচারীকে বিভিন্ন কৌশলে অনায়াসেই অচেতন করে সর্বস্ব লুটে নিয়ে যাচ্ছে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। রাজধানীর বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং রেলওয়ে স্টেশন এলাকাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক সক্রিয় হয়ে উঠেছে তারা। ইতোমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি ইউনিটের নজরবন্দিতে রয়েছে সংঘবদ্ধ অজ্ঞান পার্টির একটি চক্র। যেকোনো সময় তাদের গ্রেফতার করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ঢাকা, চিটাগাং ও বরিশাল রুটসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে নানা কৌশলে সক্রিয় রয়েছে অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির প্রায় আড়াইশ সদস্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির সদস্যদের গ্রেফতার করলেও এই চক্রের কৌশলের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে ব্যবসায়ী, প্রবাসীসহ পেশাজীবী মানুষ, এমনকি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরাও।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৫টির অধিক চক্র রয়েছে। তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম রুট, সাভার ও আশুলিয়ায় বেশি সক্রিয়। যাত্রাবাড়ী থেকে চট্টগ্রাম রুট নিয়ন্ত্রণ করছে একটি চক্রের মূল হোতা খোকন। এই চক্রের সদস্য সাত থেকে আটজন।
এদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, চিকিৎসকের কোনো প্রকার ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই সহজে ক্ষতিকারক ট্রাঙ্কুলাইজার বা তীব্র ঘুমের ওষুধ কিনে তা ব্যবহারের পর পথেই সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা বেড়ে গেছে। ভয়ঙ্করভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই চক্রটি। চট্টগ্রাম রুটে খোকন নামে একজনের নেতৃত্বে একটি চক্র রয়েছে। ওই চক্রটি সম্প্রতি কয়েকটি মাইক্রোবাসসহ বেশকিছু পরিবহনের চালকদের অজ্ঞান করে সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। খোকনের চক্রের সদস্য রয়েছে সাত থেকে আট জন। তাদের টার্গেট যাত্রাবাড়ী থেকে চট্টগ্রাম রুটের কোনো নির্জন এলাকায় গাড়ি বা মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া।
সূত্র জানায়, প্রথমে তারা রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে টার্গেট করে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে তিন থেকে চারজন। চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে আরও কয়েকজন যাত্রী তুলে নির্জন স্থানে নিয়ে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখায়। যাত্রীরা বাধা দিলে চোখে মলম লাগিয়ে বা অজ্ঞান করে কেড়ে নেয় মূল্যবান জিনিসপত্র। এমনকি যাত্রী বা চালকরা জবরদস্তি করলে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যার মতো ঘটনা ঘটায় চক্রের সদস্যরা। এই চক্রের কয়েকজন সদস্যকে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার আল মঈন জানান, অজ্ঞান পার্টি বা মলম পার্টির তৎপরতা কিছুটা বেড়েছে। সারা দেশে অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির প্রায় ২৫টি চক্র রয়েছে। ওই চক্রের সদস্য আড়াই শতাধিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে ধরা পড়লেও জামিনে বেরিয়ে ফের একই পেশায় যুক্ত হচ্ছে তারা। আমরা ওইসব অপরাধীকে ধরতে কাজ শুরু করেছি।
যে কৌশলে অজ্ঞান করা হয় : তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মাত্রার ঘুমের ওষুধের সঙ্গে মধু ও সুস্বাদু খাদ্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি হয় বিশেষ হালুয়া। সেগুলো মোড়কবন্দি করে যৌন উত্তেজক, চর্মরোগ, অ্যাজমা বা বাতের ব্যথার কবিরাজি ওষুধ হিসেবে কৌশলে গণপরিবহনে বিক্রি করা হয়। অনেকে চা, কফি, বিস্কুট, ডাবের পানি, ফল বা পান বিক্রি করে থাকে। কিন্তু এসব বিক্রি অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের ফন্দি। এই ফাঁদে ফেলে অজ্ঞান করে যাত্রীর মূল্যবান জিনিষপত্র কেড়ে নিচ্ছে। এমনকি এই খপ্পরে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
কী ব্যবহার করছে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা : সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর জানিয়েছে, ১০টি কোম্পানি ভিন্ন ভিন্ন নামে এই ওষুধ বাজারে বিক্রি করছে। এই ওষুধ দ্রুত কাজ করে। এতে গভীর ঘুম হয়। আর পরিমাণে কম লাগে। এর বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ খাওয়ার আগে বা পরের ঘটনা মানুষ মনে করতে পারে না। তবে যাদের কিডনি বা যকৃতের সমস্যা আছে, তাদের ওপর এই ওষুধ মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কিছু রোগীর রক্তের নমুনা পরীক্ষা করেছিলেন একদল চিকিৎসক ও গবেষক। তারা দেখেছেন রোগীদের মূলত ট্রাঙ্কুলাইজার বা দ্রুত ঘুমানোর ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে সঙ্গে অন্য ওষুধের মিশ্রণ ছিল। রক্ত পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ সম্প্রতি এশিয়া প্যাসিফিক জার্নাল অব মেডিকেল টক্সিকোলজিতে ছাপা হয়েছে।
ওই সময় প্রবন্ধটির সহলেখক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ মন্তব্য করেছেন, অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে বিষক্রিয়ায় মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়। কিন্তু বিষক্রিয়ার ধরন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল না। এই গবেষণার একটা উদ্দেশ্য ছিল, ঘটনার শিকার মানুষেরা কোন ধরনের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়, তা জানা।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে বেশ কয়েক ধরনের ঘুমের ওষুধ আছে। এর মধ্যে কিছু আছে ‘ট্রাঙ্কুলাইজার’ বা তীব্র ঘুমের ওষুধ। এটা খাওয়ানো বা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে। মানসিক রোগীদের কারও কারও এই ওষুধের প্রয়োজন হয়। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এমন ওষুধের কেনা, বেচা ও ব্যবহার নিষেধ।
শনিবার ডিএমপির পাবলিক রিলেশন্স ও মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, রাজধানীতে প্রায়ই অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টি চক্রের সদস্যরা সক্রিয় হয়ে উঠছে। এটি চলমান অপরাধ। ডিএমপির আটটি বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাবও তৎপর রয়েছে বলে জানান তিনি।