ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

http://www.shomoyeralo.com/ad/Untitled-1.jpg
সঙ্কটের মুখে চট্টগ্রামের সাত হাজার জেলে
ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ২:৫০ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 66

সাম্প্রতিক সময়ে মাছ আহরণ কমেছে বঙ্গোপসাগরে। এতে মহা সঙ্কটের মুখে পড়ছে চট্টগ্রামের উপকূলীয় সাত হাজার জেলে। প্রভাব পড়ছে বাজারেও। এমনকি দেশের অর্থনীতিতেও হ্রাস পাচ্ছে মৎস্য খাতের অবদান। এমন মত বিশেষজ্ঞদের। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি ট্রলারের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও নির্বিচারে মাছ শিকার, রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারে মৎস্যক্ষেত্রের ক্ষতিসাধন, প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার, তেলসহ বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর বর্জ্য এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত প্রভাবই মাছ কমে যাওয়ার কারণ।

বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদ-নদীতে মাছের সংখ্যা কমছে। তবুও মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে এবং ইলিশ রক্ষায় সফলতা থাকলেও বঙ্গোপসাগরে অন্যান্য মাছের পরিমাণ কমেছে। কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছের প্রজাতি অনেকটা নিঃশেষ হতে চলেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে গভীর সমুদ্রে মাছ আছে। সাগর একটু শান্ত হলেই জালে মাছ পড়তে শুরু করবে। 

মাছ আহরণের তথ্য : মৎস্য অধিদফতরের তথ্য মতে, ২০০১-০২ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে সামুদ্রিক মৎস্য খাতের অবদান ছিল প্রায় ২২ ভাগ, সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে এর অবদান কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ ভাগে। দুই দশকে সামুদ্রিক মৎস্য খাতের অবদান কমেছে সাত ভাগের বেশি।

মৎস্য অধিদফতরের চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালক বিক্রম জিৎ রায় বলেন, সমুদ্রে ইলিশ রক্ষায় সফলতা এলেও কমেছে লাক্ষ্মা, রূপচাঁদাসহ নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। ২০১১-১২ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে লাক্ষ্মা মাছ আহরণ হয়েছিল তিন হাজার ৩০ মেট্রিক টন। ১০ বছরের ব্যবধানে ২০২০-২১ অর্থবছরে মাছটির আহরণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬৩ মেট্রিক টনে। 

এ ছাড়া এক দশকের ব্যবধানে রূপচাঁদা আহরণ চার ভাগের তিন ভাগ কমেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে সাগরে রূপচাঁদা ধরা পড়েছিল প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০২০-২১ বছরে ধরা পড়েছে ৯ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি।

কমেছে সাগরের চিংড়ি আহরণও। এক দশকে চিংড়ি আহরণ কমেছে ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। ২০১১-১২ অর্থবছরে সাগরে চিংড়ি আহরণ হয় প্রায় ৫৮ হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি।

একই সঙ্গে কমেছে নদ-নদীর মিঠা পানির মাছও। এক দশকের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে মিঠা পানির মাছ। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই জাতীয় মাছের আহরণ ছিল প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই মাছের আহরণ কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি।

প্রভাব পড়েছে বাজারে : সামুদ্রিক মাছ আহরণ কমার প্রভাব পড়েছে বাজারেও। চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজার, চকবাজার, কাজীর দেউরি বাজার, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন বাজারে কম মিলছে সামুদ্রিক মাছ লইট্যা, কোরাল, লাক্ষ্মা, রূপচাঁদা, পোয়া, বাইলা ও সুরমা। এসব বাজারে বিক্রি হচ্ছে খামার ও পুকুরে উৎপাদিত তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, বাটা, ট্যাংরা প্রভৃতি। দামও আকাশছোঁয়া।

নগরীর বহদ্দারহাটে মাছ কিনতে আসা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম (৩৪) বলেন, বাজারে সাগরের মাছ কম। তাই পুুকুরের মাছের দাম অনেক বেশি। গত ৮-৯ মাস আগেও পুকুরের ১২০ টাকার তেলাপিয়া কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকায় এবং রুই ও কাতলা ৪০০-৫৫০ টাকা কেজিতে। চিংড়ির পোনা বিক্রয় হচ্ছে ৬০০-৭০০ টাকা কেজিতে। এতে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মো. শরীফুল হাসান বলেন, চলমান বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেদের জালে মাছ ধরা পড়ছে না। এ কারণে বাজারের মাছের সঙ্কট চলছে। এখন বাজারে সামুদ্রিক মাছ নেই বললে চলে। তবে কিছু বাজারে আগের মজুদ করা সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। কয়েক দিনের মধ্যে মজুদ শেষ হলে সঙ্কট আরও বাড়বে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামদ্রিক মাছের পাইকারি বাজার হিসেবে খ্যাত আনোয়ারা উপজেলার বটতলী বাজার, মালঘর বাজার, মহাল খান বাজার, জয়কালীর হাট, বাঁশখালীর চাঁনপুর বাজার, গুনাগরি, রামদাশ মুন্সীরহাট, বৈলছড়ি কেবি বাজার, জলদি মিয়ার বাজার, শীলকূপ টাইমবাজার, চাম্বল বাজার, নাপোড়া বাজার, পুঁইছড়ি প্রেমবাজারসহ অন্তত ৩৫টি বাজারে সামুদ্রিক মাছের তীব্র সঙ্কট চলছে।

মাছের সঙ্কট চলছে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, বাঁশখালী, চকরিয়া, কুতুবদিয়া এমনকি কক্সবাজারের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার হাট-বাজারগুলোও। ফলে চাহিদার সঙ্কট দেখা দেওয়ায় পুকুরে উৎপাদিত তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, বেড়, গ্রাসকার্পসহ সব সামুদ্রিক মাছ চড়া মূল্যে বিক্রয় হচ্ছে। 

বাঁশখালীর গুনাগরি বাজারে মাছ কিনতে আসা কবির আহমদ বলেন, ‘আমার ৬০ বছর বয়সের মধ্যে বাজারে এই রকম সমুদ্রের মাছ সঙ্কট আর দেখিনি।’ একই কথা বলেন সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া উপকূলের বাসিন্দা কাসেম রাজাও। 

মাছ সঙ্কটের কারণ : বিজ্ঞানীরা বলছেন, জ্বালানি ও পরমাণুবর্জ্য এবং জমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক সারসহ কীটনাশকের ব্যবহারে সৃষ্ট নাইট্রাস অক্সসাইড সাগরতলকে অক্সিজেনশূন্য করে তুলছে। নাইট্রাস অক্সসাইড থেকে তৈরি হচ্ছে নাইট্রাইড, যা সমুদ্রপরিবেশে এককোষী শৈবাল সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করছে। ওই শৈবাল ডি-কম্পোড হওয়ার পর সৃষ্ট ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেন খেয়ে শেষ করে ফেলছে। অক্সিজেনশূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করা না গেলে সমুদ্রের পরিবেশ, মৎস্য, প্রাণী ও উদ্ভিদসম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

বিষয়টি উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, সমুদ্রে বাংলাদেশ সীমানার কাছাকাছি অক্সিজেনশূন্য এলাকার সৃষ্টি হয়েছে। পানির নিচে অক্সিজেন ছাড়া মাছ বা জলজ প্রাণী টিকে থাকা সম্ভব নয়। হয় তারা মারা পড়বে, না হয় স্থান ছাড়তে বাধ্য হবে। বঙ্গোপসাগরে কম অক্সিজেন বা শূন্য অক্সিজেন এলাকার বিষয়টি ধরা পড়ে ২০১৬ সালে। এলাকাটি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ৬০০-৭০০ মাইল দূরে। এলাকা চিহ্নিত করা হলেও আসলে এর প্রকৃত অবস্থান কোথায়, পরিধিই বা কতটা তা এখনও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে যথাযথ অনুসন্ধান ও গবেষণার বিকল্প নেই। 

পাশাপাশি বিদেশি ট্রলারের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও নির্বিচারে মাছ শিকার, রাসায়নিক ব্যবহার করে মৎস্যক্ষেত্রের ক্ষতিসাধন, প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার, আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত প্রভাবই মাছ কমে যাওয়ার বা আহরণ কম হওয়ার কারণ। এসব সমস্যা নতুন না হলেও তা প্রতিকারে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে তেমন দেখা যায়নি বলে মত প্রকাশ করেন ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া। 

হাসি নেই জেলেদের মুখে : ১৯ সেপ্টেম্বর আনোয়ারা উপকূলের উঠানমাঝির ঘাট, ছত্তার মাঝির ঘাট, গলাকাটার ঘাট, বাঁশখালীর শেখেরখীল ফাঁড়ির মুখ, চাম্বল বাংলা বাজার ঘাট, গন্ডামারা বড়ঘোনা খাটখালী, খানখানাবাদ প্রেমাশিয়া ঘাট ঘুরে দেখা যায় সাগরে মাছ আহরণকারী জেলেদের মুখে হাসি নেই। 

এ সময় একাধিক জেলে হতাশা প্রকাশ করেন। এরমধ্যে বাঁশখালীর মনকিচর এলাকার ফরিদ মাঝি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে খরচ বেড়ে গেছে। আর এর আগে যে পরিমাণ মাছ পেতাম এখন বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেই পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি নিষেধাজ্ঞা পালনের সময়কার দেনা তো শোধ করতে পারিনি। এখন আবার নতুন করে ধারদেনা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।’

আনোয়ারার ছাত্তারমাঝি ঘাট এলাকার আড়তদার আব্দুর রহিম বলেন, চার-পাঁচ দিন আগে আবহাওয়া কিছুটা ভালো হলে জেলেরা সমুদ্রে মাছ শিকারে যায়। কিন্তু হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হলে আবার তারা তীরে ফিরতে শুরু করেছে। বর্তমানে সাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এতে গত সোমবার একটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। তবে জেলেদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

উঠানমাঝি ঘাট এলাকার জেলে সমবায়ের সভাপতি মো. নাছির বলেন, গভীর সমুদ্রে মাছের সংখ্যা খুবই কম। তার উপর সাগরে লঘুচাপ লেগেই আছে। এতে সাগরে জাল ফেলতে পারি না। তার আগেই উপকূলে উঠে আসতে হয়। এই আসা-যাওয়ায় আমরা লসে আছি। এ কারণে জেলের মুখে নেই হাসি। তা ছাড়া মাছ না পেয়ে অনেক জেলে দস্যুর পথ বেছে নিয়ে মাছ লুটপাট করছে। 

মৎস্য বিজ্ঞানীর মতামত : চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাসান আনোয়ারুল কবির বলেন, নির্বিচারে সামুদ্রিক মাছ শিকার এবং অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর আরও মৎস্যশূন্য হয়ে যেতে পারে। 

তবে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে এবং ইলিশ রক্ষায় সফলতা থাকলেও বঙ্গোপসাগরে মাছের পরিমাণ কমছে এবং কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছের প্রজাতি অনেকটা নিঃশেষও হতে চলেছে। এসবের দিকে আমাদের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, তা ছাড়া এখন ভরা মৌসুমেও মাছ না পড়ার কারণ হচ্ছে সাগর যেদিকে উত্তাল থাকে সেদিক থেকে মাছ সরে শান্ত থাকা সাগরের অভিমুখে চলে যায়। যার কারণে এরকম প্রভাব পড়েছে। তবে সাগরে ইলিশ রয়েছে।

/এসকে


আরও সংবাদ   বিষয়:  জেলে  




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com