ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

http://www.shomoyeralo.com/ad/Untitled-1.jpg
উচ্চশিক্ষায় আমাদের অতি-আগ্রহ আসলেই কি সুখকর?
আই.এফ.এম. আশিক বিল্লাহ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১১:০৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 73

আমাদের দেশের ছেলেমেয়ে এবং অভিভাবকরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রায়ই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করলেও একটি বিষয়ে দুই পক্ষই একমত ও অতি-উৎসাহী। বিষয়টি হলো-‘উচ্চশিক্ষা গ্রহণ’, যাকে প্রচলিত সাদা ভাষায় ‘অনার্স-মাস্টার্স পাস’ বলা হয়ে থাকে। 

কোনোভাবে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করলেই আমাদের শিক্ষার্থীরা পাবলিক, প্রাইভেট কিংবা প্রয়োজন অনুসারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার জন্য ভর্তি হয়। উচ্চশিক্ষা বা স্নাতক পাস দেওয়ার জন্য সবার এত উৎসাহের বিষয়টি নিয়ে আমাদের খুশি হওয়া প্রয়োজন এই ভেবে যে, দেশের মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, শিক্ষার আলোয় দেশের অন্ধকার দূর হবে এবং আমরা সবাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারব। তবে, বিকল্প পথ অবশ্যই বের করতে হবে। 

দেশের গার্মেন্টস শিল্প, বহুজাতিক কোম্পানি ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে অনেক বিদেশি নাগরিক কর্মরত, যারা প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের মুদ্রা নিজ দেশে পাঠাচ্ছে। অথচ, বাংলাদেশে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শতাধিক। এ ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাজারখানেক কলেজ রয়েছে। প্রতি বছর এসব প্রতিষ্ঠান থেকে লাখের কাছাকাছি গ্র্যাজুয়েট বের হয়। এসব গ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করতে এলেও তাদের বিভিন্ন দক্ষতা একেবারেই কম। এই সার্টিফিকেটসর্বস্ব ডিগ্রি নিয়ে তারা আন্তর্জাতিক বাজার দূরে থাক, দেশীয় বাজারেই প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হয় না। প্রতি বছর নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য শহরমুখী হওয়ার হার কমে। এটি একদিক দিয়ে ভালো হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। 

যেখানে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে সেখানে গুণগত মান বজায় রেখে নামসর্বস্ব নতুন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষার মানের সম্পর্ক নেই-এ কথা অনেক গুণী বলে থাকলেও সরেজমিন প্রত্যক্ষ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। পুরনো সিলেবাস, সমন্বয়হীন পাঠ পরিকল্পনা ও যুগোপযোগী মূল্যায়ন প্রক্রিয়া না থাকায় শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হয়ে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সংলগ্ন কোনো বৃত্তিমূলক ব্যবস্থা পাচ্ছে না। একান্তই নিজের উদ্যোগে কিছু আধুনিক দক্ষতা অর্জন না করলে তাদের সার্টিফিকেট শুধু কাগজ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। 

এমতাবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা না বাড়িয়ে শিক্ষার আধুনিকায়ন ও সময়োপযোগী বিশ্বমানের পাঠ পরিকল্পনা প্রস্তুত সময়ের দাবি। দেশের একমাত্র শতবর্ষী বিশ্ববিদ্যালয়টিও বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ধুঁকছে। এ তো গেল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে খোলা এবং তাদের একাংশ কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। পয়সার বিনিময়ে সার্টিফিকেট প্রদান, মানহীন শিক্ষাদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি ও অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি প্রদান তাদের জন্য ডালভাত হয়ে গেছে। হাতে গোনা কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশই শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে পাস করিয়ে দেয় ঠিকই; কিন্তু আদৌ প্রকৃত শিক্ষা অর্জন হচ্ছে কি না তা যথেষ্ট চিন্তার বিষয়। 

এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে সব পাড়া-মহল্লায় এতসংখ্যক কলা, সমাজবিজ্ঞান,তত্ত্বীয় বিজ্ঞান অনুষদ প্রভৃতি গ্র্যাজুয়েট দিনশেষে শিক্ষা সমাপ্ত করে নিজের, সমাজের ও দেশের কী উন্নতি করেছে সেটা প্রশ্ন। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস না করে, পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে পরীক্ষার সময় ঈদের চাঁদের মতো উদয় হয়ে নিজ কার্য সমাধা করে চার বছর পর একটি কাগজ হাতে নিয়ে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।

এত এত সমস্যা, হতাশার মধ্যেও সরকার তথা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে লাখো তরুণের মুখে হাসি ফুটিয়ে রাষ্ট্রের গতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। এ জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি প্রয়োগের পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের এটা বুঝাতে হবে যে, স্নাতক-স্নাতকোত্তর পড়াই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। যেখানে অধিকাংশের শিক্ষাগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি ভালো কর্মসংস্থান সেখানে অকারণে, অনিচ্ছায় সার্টিফিকেটের ছালা মাথায় নিয়ে খালি মাথায় ঘোরাঘুরি করা নেহাত সময়, শ্রম ও পয়সার অপচয় এবং রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা উন্নত হয়ে গড়ে ওঠার অন্তরায়। এসব কিছু সমাধানের লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে-নির্দিষ্ট শ্রেণি থেকে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত একটি কিংবা দুইটি কারিগরি কোর্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্কুল/কলেজ শেষে যারা একান্তই পড়াশোনা করতে ইচ্ছুক তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দিয়ে বাকিদের উচ্চতর কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। 

সবার কর্মসংস্থান যেন হয় সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওয়ার্কশপ তৈরি করতে হবে, যা ওই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য ব্যবহার হবে। এখানে বিষয়টি অতি সংক্ষেপে বলা হলেও এটি একটি বিরাট প্রক্রিয়া, তাই প্রয়োজনে বিদেশি সহায়তা নিয়ে কারিগরি শিক্ষার উন্নতিসাধন করা যেতে পারে।

পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন এবং  কারিকুলাম পরিবর্তন করে সময়োপযোগী বিশ্বমানের কারিকুলাম ও পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের শুধু পুস্তকের সঙ্গে সংযুক্ত না রেখে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তরুণরা যখন কর্মসংস্থান ও অর্জিত শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ পাবে, তখনই আমরা নিজেদের সফল দাবি করতে পারব। নতুবা, প্রতি বছর সার্টিফিকেট বিলানোর মতো প্রতিষ্ঠান যদি তৈরি হতেই থাকে তবে অচিরেই এমন সময় আসবে যে, রাস্তায় চোখ বন্ধ করে ঢিল ছুড়লে সেটা কোনো-না -কোনো গ্র্যাজুয়েটের মাথাতেই পড়বে।
শিক্ষা সবার জন্য আবশ্যক; কিন্তু উচ্চশিক্ষা শর্তসাপেক্ষে আবশ্যক।

 একটি উন্নয়নশীল দেশে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উচ্চশিক্ষিত কর্মসংস্থানের আশায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছে-এটা খুব ভালো অর্জন নয়। তা ছাড়াও, উচ্চশিক্ষাকে সহজলভ্য বানিয়ে এর মূল উদ্দেশ্য নষ্ট করে দেওয়াও সামাজিক অপরাধ বৈকি। ঝাঁকে ঝাঁকে চিন্তাশক্তিহীন অকর্মণ্য সার্টিফিকেটধারী গ্র্যাজুয়েট দিয়ে দেশের বা দশের কোনো উন্নতি তো হবেই না, উল্টো সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাবে। উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য হলে যাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের নৈতিক যোগ্যতা নেই তারাও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে। 

অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা যদি দ্রুত শুরু না করা হয়, তবে এতসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তির চাপে বাংলাদেশ একসময় দিশেহারা হয়ে যাবে। এর পরেও যদি উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য ও উন্মুক্ত করা উচিত বলে মনে করা হয়, তবে তাদের উদ্দেশ্যে এই কথা বলা উচিত-এই মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে কারিগরি শিক্ষার প্রতি মনোযোগী হতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com