ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৬ জুন ২০২২ ১১ আষাঢ় ১৪২৯
ই-পেপার রোববার ২৬ জুন ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

হারপারস ফেরি ও ব্রিটিশরাজ
মঈনুস সুলতান
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০২২, ১:৩৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 95

হারপারস ফেরিতে আজকাল ট্যুরিস্ট যাচ্ছে বিস্তর। তাই চল হয়েছে পুরনো ফ্যাশনের ছাদখোলা ট্রলির। পাহাড়ের শিলা কেটে করা পার্কিংলটে গাড়ি রেখে ট্রলিবাসে চড়ে আসতে লাগল মাত্র মিনিট বিশেক। শিনানডোহ নদীর সঙ্গে এখানে পটোমাক রিভার এসে মিশেছে পাহাড়ের শিলা কেটে। মোহনার জলে মস্ত মস্ত সব পাথরের চাঁই, তেজি স্রোতে জল ছিতরে যাচ্ছে চারদিকে। আর তার দুই পাড়ে আস্ত দুই জাম্বুবান পাহাড়। এখানে পটোমাক নদী বেঁকে গেছে ঘোড়ার নালের আকৃতিতে। আর তাতে তৈরি হয়েছে বদ্বীপের মতো ব্লুরিজ মাউন্টেনের ছত্রছায়ায় একচিলতে ডাঙ্গা। এখানে আছে আড়াইশ-তিনশ বছরের পুরনো একটি জনপদ। ট্রলি চড়ে আসতে আসতে চোখে পড়ে, শিলাপাথর কেটে পাহাড়ের সুড়ঙ্গ দিয়ে চলে যাওয়া রেলপথ। যুক্তরাষ্ট্রেÑ ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের এই এলাকায় রেললাইন স্থাপিত হয় আঠারো শতকের পয়লা দিকে। পটোমাক নদীর মাঝ বরাবর সে আমলের একটি রেলওয়ে ব্রিজের খাম্বাগুলো নদীজলে আজ অবধি ঘাসপাতা গজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ হয়ে।

হারপারস ফেরিতে ঢুকতে ঢুকতে চোখে পড়ে, এখানে-ওখানে দাঁড় করিয়ে রাখা রেলগাড়ির মরচে পড়া ফিকে লাল রঙের বগি, জংধরা স্টিম-ইঞ্জিন আর স্তূপ করা সিলপাট। শহরটির গুরুত্ব ঠিক রেললাইনের কারণে নয়। পর্যটকরা মূলত আসে এখানে সাবেকি আমলের সেনা ছাউনি দেখতে। ছাউনির ভাঙাচোরা ছাদ-ধসা পাথরের স্ট্রাকচারটি এখনও আছে বটে, তবে ওখানে অবহেলায় পড়ে থাকা কয়েকটি জংধরা কামান ছাড়া দেখার বিশেষ কিছু নেই। এ বদ্বীপে দিগন্ত আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে ব্লুরিজ মাউন্টেন নামের বিশাল একটি পাহাড়। 

জনপদের এত কাছে এ পাহাড়টির অবস্থান যে, চাইলেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার শিলাপাথর ছোঁয়া যায়। পাহাড়টির শরীর কঠিন পাষাণে গড়া হলেও তাতে আছে হাজার-বিজার গাছপালা ও লতাফুল। তাদের ছায়া এসে পড়ে জনপদের একটিমাত্র রাজপথে, আর অটাম এলে সড়ক ভরে যায় লোহিত, অরেঞ্জ ও ফিকে সোনালি রঙের ঝরা পাতায়। আদি থেকেই এ জনপদে প্রশস্ত স্থানের বড় অসঙ্কুলান। ব্লুরিজ মাউন্টেনের কোমরে বেড়ি দিয়ে জড়িয়ে আছে দুই-দুটি নদী, তো সেদিকে দরদালান কিংবা দোকানপাট বাড়ানোর উপায় নেই। তাই জনপদটি উঠে গেছে ঢালু পাহাড়ের স্তরে স্তরে।

আমি খুব সঙ্কীর্ণ একটি সড়ক ধরে আস্তে-ধীরে হেঁটে পাহাড়ের দিকে উঠতে শুরু করি। খানিকটা চড়াই-উতরাই ভেঙে এক জায়গায় এসে দেখি, মাউন্টেন-ওয়ালের একটি কেইভে উবু হয়ে একদল পর্যটক ঢুকে যাচ্ছে। বিষয় কীÑ তা নিরিখ করার জন্য একটু দাঁড়াই। এখানে পায়ে চলার পথের ঠিক কিনারে- এক জামানায় পাহাড়ের শিলা কেটে তৈরি করা হয়েছিল কারাগার। তার গারদের শিকগুলোয় লতিয়ে উঠেছে বুনোফুল। শীতে এ অঞ্চলে তুষার পড়ে বিস্তর। পাশেই শিলাপাহাড় কেটে করা আরেকটি খোপে খোপে বিভক্ত কেইভ। এ গুহাটি ছিল সে আমালের বাসিন্দাদের রুট-সেলার। সামারে আলু, গাজর, বিট, মটরশুঁটি আর বয়াম ভরা ক্রেনবেরী রাখা হতো এ রুট-সেলারে। নোনা মাংস, মসলাপাতি ও ওয়াইনের পিপাগুলোও প্রিজার্ভ করা হতো ওখানে। আরও খানিকটা আগ বাড়াতেই চোখে পড়ে, পাহাড়ের বেশ উপরের স্তরে শিলা কেটে সমতল আঙিনা বানিয়ে গড়া হয়েছে ছোট্টমোট্ট একটি চার্চ। আমি গির্জার ঘণ্টাঘরের তলায় দাঁড়িয়ে নিচের জনপদের দিকে তাকাই। এখান থেকে হারপারস ফেরির ঘরদুয়ারের চাল ছাড়িয়ে পটোমাক নদীর বেড়ি দেওয়া বদ্বীপের শেপটি পরিষ্কার দেখা যায়।

এদিকে পাওয়া যায় পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের তথ্যবহুল ফলক। তাতে লিপিবদ্ধ আছে ১৮৫৯ সালের গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রে ক্রীতদাস প্রথা রহিত করার বিষয় নিয়ে সিভিল-ওয়ার চলছে। হারপারস ফেরির সেনা ছাউনির সঙ্গেই ছিল আর্মারির দালান, যা ব্যবহৃত হতো অজস্র অস্ত্রের আড়ত হিসাবে। রিমোট পাহাড়ি লোকেশনের জন্য বিদ্রোহী কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসরা সঙ্গোপনে এখানে এসে জড়ো হয়েছিল। জন ব্রাউনের নেতৃত্বে আচমকা আক্রমণ চালিয়ে তারা দখল করে নিয়েছিল বিপুল অস্ত্রশস্ত্র। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ সৈনিকদের কাউন্টার অ্যাটাকে তাদের হার হয়। প্রশাসন দ্রুত জন ব্রাউনের ফাঁসি দিয়ে বিদ্রোহ দমন করে।

আমাকে এ ইতিহাস বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার দায়িত্ব নিয়েছেন গ্রেইগ অ্যাডাম নামে এক বয়োবৃদ্ধ নাগরিক। অনেক অনেক বছর হলো যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী থেকে রিটায়ার করেছেন ইনি। অ্যাডাম সাহেবের নাতনি র‌্যাচেলের সঙ্গে আমার যৎসামান্য বন্ধুত্ব আছে। একসময় আমরা ইউনিভারসিটি অব পেনসিলভেনিয়ায় সতীর্থ ছিলাম। আমি যুক্তরাষ্টে এসে তাকে রিং করি। হারপারস ফেরিতে যাচ্ছি শুনতে পেয়ে র‌্যাচেল তার গ্রান্ডপা ও গ্রান্ডমা মিস্টার ও মিসেস অ্যাডামের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে। তার গ্রান্ডপা যুদ্ধের ইতিহাস লোকজনকে বুঝিয়ে বলতে ভালোবাসেন। হারপারস ফেরিতে অনেক বছর হলো তারা দুজনে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। কথা বলার কাউকে পান না। আমি তাদের সঙ্গে দেখা করলে তারা খুব খুশি মনে এখানকার যুদ্ধের ইতিহাস বুঝিয়ে বলবেন।

তো আমি র‌্যাচেলের দেওয়া সড়কের ডিরেকশন ফলো করে করে চলে আসি, পাহাড়ের মাঝ বরাবর কেটে তৈরি একচিলতে সমতলে। ওখানে রক-ওয়াল ঘেঁষে যেন ঝুলে আছে কয়েকটি কটেজ। এগুলোর একটিতে র‌্যাচেলের গ্রান্ডপা মিস্টার অ্যাডামকে খুঁজে পেতে অসুবিধা কিছু হয় না। তিনি তার কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইনোকুলার দিয়ে বোধ করি আমাকে খুঁজছেন। হ্যাট পরা দীর্ঘ দাড়িওয়ালা এ লোককে ধর্মযাজকদের মতো দেখায়। ‘গ্রিটিংস স্যার, আমি র‌্যাচেলের বন্ধু সুলতান’, বলামাত্র ‘ওয়েলকাম বয়, কামঅন আপ’ বলে বৃদ্ধ লাঠি ভর দিয়ে হিলহিলিয়ে নেমে আসেন সিঁড়ির কয়েক ধাপ নিচে। আমরা করমর্দন করি, তিনি আমাকে খুঁটিয়ে দেখে বলেন, ‘আই হ্যাভ নট সিন সামওয়ান ফ্রম ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ফর সাচ অ্যা লং লং টাইম।’ তার হাত ধরে উঠে আসি ঝুলবারান্দায়। কথাবার্তা থেকে ছড়ানো এনার্জিতে মনে হয়, মিস্টার অ্যাডামের বলার অনেক কিছু আছে। লিভিংরুমে ঢুকেই তিনি বের করে বসেন আসাম-বেঙ্গলের সে আদ্যিকালের একটি ম্যাপ। তারপর চোখে হাইপাওয়ারের রিডিং গ্লাসটি এঁটে- কোথায় আমার বাড়ি তা দেখাতে বলেন। আমি মানচিত্রে সিলেট অঞ্চলের দিকে আঙুল রাখি। তিনি যেন লোকেশনটি চিনতে পেরেছেন, এ রকমভাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ‘সো ইউ আর ফ্রম আসাম, আই নো, ইউ গাইজ গ্রো মাইটি গুড টি আপ দেয়ার... ।’ 

আমি একটি বিষয় খোলাসা করে বলি, ‘স্যার, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অনেক বছর আগে স্বাধীন হয়েছে, সিলেট হালফিল যে দেশের অংশ, তার নাম বাংলাদেশে।’ শুনে তিনি ভুরু কুঁচকে রিয়েক্ট করেন, ‘কাম অন... ফ্রিডম অব দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট? এটা তো গান্ধীর ফেন্টাসি। লিসেন বয়, অ্যাজ লং অ্যাজ চার্চিল ইজ ইন পাওয়ায়, দেয়ার ইজ নো ফ্রিডম ফর ইন্ডিয়া। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড-ওয়ারে আমি বার্মাতে যুদ্ধ করেছি ব্রিটিশ এম্পায়ারের জন্য। আমি আসামের ডিমাপুরেও পোস্টেড ছিলাম। ব্রিটিশরাজের সানসেট হতে এখনও অনেক দেরি আছে।’ থুরথুরে এ সাবেক সৈনিকের আলঝেইমার রোগে মেমরি লোপ পেয়েছে, এ তথ্যটি জানিয়ে র‌্যাচেল আমাকে আগেই সাবধান করে দিয়েছে। সুতরাং বিলাতের প্রাধানমন্ত্রী চার্চিল যে বর্তমানে গোরস্তানে আছেন, আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যে সানসেট অলরেডি পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে হয়ে গেছে, এসব তথ্য তুলে কথা বাড়াতে যাই না। কথা বলতে বলতে বৃদ্ধের দুহাত ও মুখের মাসল থরথর করে কাঁপে। তিনি চুটিয়ে ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড-ওয়ারে বার্মায় জাপানিদের অ্যাটাক করে যে মেডেল পেয়েছেন, তার গল্প করেন। হঠাৎ করে মুখ ফসকে আমি বলে ফেলি, ‘স্যার,ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড-ওয়ার নয়, আপনি সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড-ওয়ারে লড়াই করেছিলেন।’ আমার আলটপকা কমেন্টে বৃদ্ধ মহা ধন্দে পড়ে কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ সামনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকেন। তার খসখসে চামড়ায় বালুচরে কাঁকড়ার পদচিহ্নের মতো বয়সের বলিরেখা। বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে ধড়মড়িয়ে যেন জেগে উঠে তিনি বলেন, ‘তুমি কি আসার পথে মিসেস অ্যাডামকে দেখেছে?’ 

মিসেসের সঙ্গে আমার তো পরিচয় নেই, দেখলেই বা তাকে চিনব কীভাবে? জানতে চাই, ‘স্যার, মিসেস অ্যাডাম গেছেন কোথায়?’ বেশ খানিক সময় নিয়ে বোধ করি স্মৃতি হাতড়ে বৃদ্ধ বলেন, ‘তুমি আসছ তো, তাই মিসেস হুইলচেয়ারে করে শপিংয়ে গেলেন। একটু রাইস, কারি পাউডার আর চিলি নিয়ে আসবে। আই টোল্ড হার উইথআউট চিলি... নো ওয়ে... তুমি রাইস মুখে তুলতেই পারবে না।’ মিসেস অ্যাডাম কোথায় গেলেন- এ নিয়ে আমি একটু দুশ্চিন্তায় পড়ি। মিস্টার অ্যাডাম আমার হাতে বাইনোকুলারটি দিয়ে বলেন, ‘একটু বারান্দায় গিয়ে দেখ তো মিসেসের আসতে দেরি হচ্ছে কেন?’ আমি ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে সড়ক স্ক্যান করি। কিন্তু কোথাও হুইলচেয়ার চড়া কোনো বৃদ্ধাকে দেখতে পাই না। একটু দুশ্চিন্তা নিয়ে আবার লিভিংরুমে ঢুকি। মিস্টার অ্যাডাম মনে হয় চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার দাড়িওয়ালা মাথাটি ঝুঁকে পড়েছে বুকে। তার পাশে টিপয়তে রাখা পৃষ্ঠাখোলা মরক্কো লেদারে বাঁধাই একটি ভারী বই। তাতে হাইলাইট করা প্যারাগ্রাফে বার্মায় জাপ আর্মির সঙ্গে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির যুদ্ধের বর্ণনা। বৃদ্ধ বোধ করি আমাকে দেখানোর জন্য পাতাটি খুলে রেখেছেন। তাতে রাখা ভারী ম্যাগনিফাইং গ্লাসের পুরু কাচের ভেতর দিয়ে আমি দেখি- ‘ব্রিটিশরাজ’ শব্দটি বাস্তবের চেয়ে অনেক বড় হয়ে ফুটে আছে।

http://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_Send-Money_728-X-90.gif



http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]