ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৬ জুন ২০২২ ১১ আষাঢ় ১৪২৯
ই-পেপার রোববার ২৬ জুন ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

নিজেকে রাস্তা ভাবার পরের ঘটনা
ইলিয়াস বাবর
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০২২, ১:৩১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 89

হাঁটতে হাঁটতে পায়ের দিকে নজর যায় জাহিদুল হকের। মোজার ভেতর পাগুলো ঘেমে একাকার। পা নিয়ে তার একদা গর্ব ছিল দেখানোর মতো। বন্ধুদের মধ্যে তার পা-ই ছিল সবচেয়ে ফর্সা। কেমন তুলতুলে পা। বন্ধুরা মশকরার ছলে বলত, জাহিদকে উপরওলা কত কিছু দেয়! জাহিদ আড়চোখে তাকিয়ে বড় একটা শ্বাস নিত। ইয়া বড় পাহাড়ের পাশে ছোট্ট ঢিবির প্রতিবেশী হয়ে থাকার মতো  সে নিজকে মেলাতে পারে না। 

বন্ধুদের ইতরামি, পায়ের অতিমাত্রায় ফর্সামি নিয়ে কেটে যায় জাহিদের স্কুলজীবন। আশ্চর্য, কলেজ-লাইফে কোনো বন্ধু তার পা নিয়ে কথা বলেনি কোনোদিন। মানুষ একটু বড় হলে কত কিছুকে এড়িয়ে যায়- মনে মনে বলে জাহিদ। ক্যাম্পাসের আড্ডায় তখন ক্লাসটেস্ট আর প্র্যাকটিক্যালের জমজমাট উপস্থিতি। মনমেজাজ ভালো থাকলে, কেউবা তখন কথা বলত বড় ক্লাসের কোনো ছাত্রীর শরীর নিয়ে। ওর এমন, ওর তেমন... এসবে জাহিদের ভালো লাগত বটে। তবুও নিজের পায়ের দিকে তাকালে একটা চিনমিনে ব্যথা অনুভব হতো। গ্রাম ছেড়ে শহরের কলেজে পড়তে এসে ল্যাংটাকালের বন্ধুদের হারাতে হয়েছে; এখানে দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে অন্তরঙ্গ গালগল্পের উৎসমুখের সূত্র। 

নিজের কথা নিজে বলবে সে অভ্যাস কোনোদিনই রপ্ত করতে পারেনি জাহিদ। রমজানের ক্লান্তিমাখা বিকালে জুতার দিকে চোখ পড়তে কেনইবা জাহিদের পায়ের গল্প মনে পড়ে গেল সে জবাব নিজের কাছেও পায় না সে। মানুষের জীবনটা কি ঘটনা আর রটনায় ভরপুর? চলচ্চিত্রের মতো স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অভিনয়ের সুযোগ নেই এখানে, কেবলই বাস্তবতার রূঢ় হাততালি। আগ্রাবাদের ফুটপাথ থেকে কেনা সুজোড়া আগের মতো চকচকে নেই, তারাও কেমন ‘বেদিশা’। চট্টগ্রামগামী বাস কাউন্টারে যেতে যেতে দর্শনমাখা প্রশ্ন তাড়া করে জাহিদকে। আচ্ছা, জুতাদের কি ব্যথা লাগে না? কম করে হলেও দুই মণের কিছু কম আমার ওজন, এই ভার কেমনে বহন করে এত কম দামি জুতা? জুতার কি খিদে লাগে না, ক্লান্তি আসে না? এত হাঁটাহাঁটি তার বুকে চড়ে, কই কখনও তো বলে না- ভাই, এবার আমাকে খেতে দাও! অথচ আমারই ধলা পায়ে কদাচিৎ কারও পাড়া পড়লে কী ভয়ানক ব্যথায় ককিয়ে উঠি!

আহারে জুতা আমার, তোর জন্ম কি কেবল ভার বহনের? কাউন্টারে ভিড়ভাট্টা তেমন নেই আজ। হাতের কব্জি তুলে টাইম দেখার কায়দা করে জাহেদ। পুরনো অভ্যাসহেতু হাতঘড়ির দিকে নজর যায় বারবার। সাধের ঘড়িটা সেদিন কলিগদের সঙ্গে মাইজদী ঘুরতে গেলে নিখোঁজ হয়ে যায় বেখেয়ালে। ঈদ মৌসুমে অজস্র ধরনের ফন্দিফিকির, বিচিত্র ধান্দাবাজির কৌশলে কায়দা করে মেরে দিয়েছে ঘড়িটা। চোর বেটা জানে না, চকচক করলেও ঘড়িটা নিউমার্কেটের ফুটপাথ থেকে কেনা, দাম দুশরও কম। শালা, নিছোস যখন দামি কারও ঘড়ি নিতি! ফকিরের ঘরে চোর পড়ার আর সময় হলো না? টাইম দেখতে গিয়ে বড় মামার মুখটা ভেসে ওঠে জাহিদের। ভাগিনা-সম্প্রদায়ের মধ্যে জাহিদই প্রথম এসএসসি পাস করে; রেজাল্ট বেরুলে বড়মামা হাতঘড়ি উপহার দেয় ভাগিনাকে। সেই থেকে জাহিদের ঘড়িপ্রীতি। সাধের ঘড়িযাত্রা গত সপ্তাহে মাইজদী শহরে ইতি টেনে দেয় চোরের বাচ্চা চোরা। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখে জাহিদ, ইফতারের বাকি প্রায় দুই ঘণ্টা। রানিং গাড়ির টিকেট নিলে ফেনীর যাত্রা বিরতিতে ইফতার করা যাবে। কাউন্টারে টাকা দিয়ে টিকেট হাতে নেয় জাহিদ। গাড়ি আসতে মিনিট ১৫ বাকি। কাউন্টারের এক কোনায় বসে আবারও পায়ের জুতাজোড়া পরখ করে নেয় জাহিদ। খিল খোলার মতো ডান পায়ের সু-টা হাতে নেয় জাহিদ। সোল্ড অনেকটা ক্ষয়প্রাপ্ত, অতীতে মুচির হাতে পড়ার নিদর্শন হয়ে উঁকি দিচ্ছে সেলাইয়ের সুতা। চাপা দীর্ঘশ^াসে নিজেকে তার জুতার মতোই অসহায় লাগে।

গাড়ি চলছে জগতের বেশুমার কথা-বাজার নিয়ে। পাশের সিট খালি। অসম্ভব গরমে, এই অকালে কারই বা প্রয়োজন বিনে জার্নি করে? কাঁধের ব্যাগটা খালি সিটে রেখে মোবাইল হাতে নিতে গিয়েও নেয় না জাহিদ। বারবার মন বলছে, মাকে ফোন দিই। কেমন আছি, কিসে আসছি এসব জিজ্ঞাসার পর মা বলবে, তোমার ফর্দমতো কেনাকাটা করে রেখেছে তোমার বাবা। তিন বোনের শ^শুরবাড়ির সবার জন্য জামা-জুতা, দুই ভাইয়ের ছেলেমেয়ের জন্য কিনেছে চয়েজমতো। ও হে, বয়স্কগোছের তিনটা শাড়ি কিনেছে; মুরব্বি আছে কেবল তেনারাই, তোমার জেঠি, নানি, দাদি শাড়ি পেয়ে বেজায় খুশি। বাকি কেবল তোমার বাবা, ছোটভাই আর আমি। কত ধার নেওয়া যায় মানুষ থেকে, তুমি এলে পরে আমরা নেব। হু, জাহিদ এসব বলেছিল মাকে, প্রথমবার ঈদ করছি চাকরি পাওয়ার পর, সবাইকে কাপড়চোপড় দিতে হবে। কত টাকা যাবে আর! অসুবিধা নাই, বাবাকে বলো কারও থেকে নিয়ে ম্যানেজ করতে, বেতন-বোনাস একলগে পেলে কম হবে না। গাড়ি চলছে সাঁ সাঁ করে। বাড়িঘর- গাছপালার সঙ্গে দৌড়ছে জাহিদের মন। পলে পলে মনে পড়ছে রমজানের আগে বাড়িতে বলে আসা কথাগুলো। বয়স্ক-বেকার বাবা এসব টাকা এখন শোধ দেবে কোত্থেকে? জাহিদ কাকে বলবে, ছয় মাস না হওয়ায় সে বোনাস পায়নি! 

বেতনের টাকায় মেসখরচ, যাওয়া-আসার খরচ বাদ দিলে যা থাকে, তাতে দুই বোনের শ্বশুরপক্ষকে বুঝ দিতেই হয়ে যাবে হাওয়া। জানলা ধরে বাইরে অবাক তাকিয়ে থাকে জাহিদ। আগের মতো কাউকে বলা যাবে না আমি ছাত্র, টাকা নাই! অমনি রে রে করে উঠবে, চাকরি করছ না? আশৈশব বন্ধুগুলো কেমন ন্যাওটা, কারও চাকরি হলে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার আনন্দে বেকার থেকে আকার হওয়া বন্ধু থেকে বাগিয়ে নেয় ট্রিট। সে এক মজা, উপভোগ করা জীবনের সৌন্দর্য।

ক্লান্তির ঘোরলাগা সময়ে সামনে প্রচণ্ড জ্যাম দেখে বিরক্তি চরমে ওঠে জাহিদের। মিছিলের কারণে দীর্ঘ জ্যাম সামনে। সমুখে ব্যানার ধরা। ব্যানারের ভাষা বড় করুণ, তিন মাসের বকেয়া বেতন আর ঈদে বোনাস চায়। কান ফাটানো স্লোগান। পাশের পোশাক কারখানার শ্রমিক ওরা। গার্মেন্ট মালিকেরা ঈদ আনন্দ করবে বিদেশে আর রক্ত-ঘামঝরানো শ্রমিকেরা করবে বেতন-বোনাসের আন্দোলন! অদ্ভুত প্রতিদান বটে। ড্রাইভারদেরও ধৈর্যের বালাই নেই, ভোঁ ভোঁ করে হর্ন চাপছে। মিছিল হৃদয় দিয়ে পরখ করে জাহিদ। আশ্চর্য, মিছিলের প্রতিটি নারী-পুরুষের মুখে নিজের মুখ দেখতে পায় সে! অবিকল নিজের সুরত বসে আছে মিছিলের মানুষদের মুখে। এ-ও সম্ভব? নিজের মুখে হাত দেয় একবার জাহিদ, আরেকবার তাকায় নিজের ধলা পায়ের দিকে। সবই ঠিক জায়গায় আছে। মিছিল রাস্তা ক্রস করে ফ্যাক্টরির দিকে যেতে জ্যাম আলগা হয়ে আসে। গাড়িগুলো যার যার গন্তব্যে ছুটতে অস্থির। হর্নের ছড়াছড়িতে জাহিদের বাসটি ছেড়ে দেয় ধুম করে। 

পাশের গাছগুলো সটান দাঁড়িয়ে আছে প্রখর গরমের ভেতর। গাঢ় সবুজ পাতার মাঝে খেলা করছে ক্লান্তিহীন সতেজ-সবুজ। বৃক্ষেরা এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পায় কোথায়, মনে মনে ভাবে জাহিদ। ভাবনার অতলে হারাতে গিয়েও ফিরে আসে জাহিদ, পেটে ক্ষুধার নীরব চিৎকারে। সারাদিন অফিসে প্রচণ্ড চাপ ছিল ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস হিসেবে। পিয়নের চাকরি, অফিসিয়াল পদ এমসিজি। সবার আগে এসে টেবিল-চেয়ারে তোয়ালে বুলিয়ে কাজ শুরু হয়, যেতে হয় সবার শেষে, তালা দিয়ে। ওদিকে ওভারটাইম খেয়ে দেয় সিনিয়র পিয়ন। জুনিয়র পিয়ন বলে স্যারেরা আদেশের ওপর রাখে। পান থেকে চুন খসলেই কাস্টমারের সামনে শুনিয়ে দেয় গরম কথা। ম্যানেজার থেকে কালকে জয়েন করা ক্যাশ অফিসারটি পর্যন্ত তখনও থাকে, অর্ডার ক্যারি করতে দেরি হলো কি-না। যোগ্যতা নয়, পদমর্যাদা কথা বলে এখানে। বস ইজ অলওয়েজ রাইট বাক্যটির মাহাত্ম্য তখন বড় করে ধরা দেয় জাহিদের কাছে। কাজ করো, মুখ বুজে থাকো, ভেতরের মানুষটিকে বলে সে। বাসের জানলা দিয়ে থুতু ফেলতে নজরে পড়ে পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে চলা ইয়া বড় লরির দিকে। অবাক মানে নিজের কাছে, এত বড় বাহন! ন্যাংটা শরীর, শক্তি বলতে কেবল চাকাগুলো। ঝগড়া নেই, আবদার নেই বেশুমার বোঝা নিয়ে চাকাগুলো চলতে থাকে বিরামহীন। জাহিদের মাথা ঘুরছে লরির চাকার লাহান, আচমকা ভাবনারা পেয়ে বসেছে তাকে। বিচিত্র, বহুবর্ণ এসব জিজ্ঞাসার ভেতর প্রবল অসহায় বোধে একপ্রকার ঘৃণার দলা ছুড়ে দেয় নিজের দিকে। বাকি টাকা বাবা শোধ দেবে কীভাবে? অন্যদের ঈদশপিং কীভাবে হবেÑ এসব প্রশ্ন ছ্যাঁচড়ার মতো লেগে আছে বুকের কাছে। পেছনের সিটের যাত্রীদের কোনো বাচ্চা হয়তো কেঁদে ওঠে তখন, অমনি মা না কে যেন খাও বাবা, চিপসটি খাও, বলতেই কান্না সাঙ্গ। কান্নার একটা বয়স আছে, সৌন্দর্য-সিদ্ধান্ত আছে। মায়ের কাছে কেঁদেকেটে বলার বয়স কি আছে জাহিদের?

সম্মানিত যাত্রীগণ, ইফতার ও নামাজের জন্য আধাঘণ্টা যাত্রাবিরতি। এর মধ্যেই আপনারা সব সেরে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করবেন- গাইডের এমন ঘোষণায় চোখ মেলে জাহিদ। অসম্ভব সুন্দর এই গোধূলিবেলায় নিজেকে রাস্তা ভাবতে শুরু করে সে। কত ধরনের বাহন চলবে, কত লোক হাঁটবে, টুঁ শব্দটি করা যাবে না। সমাজ-সংসারের যাবতীয় ভার একলা বয়ে বুক চিতিয়ে দিতে হয় হাসিমুখে। বড় বাহনের সীমাহীন যন্ত্রণায়, বৃষ্টি-ঝড়ে এমনকি মানুষের অকথ্য নির্যাতনে রাস্তার বুক খানাখন্দক হয়ে যাবে; করুণায় কখনও পড়তে পারে সাময়িক প্রলেপ, তবুও সহ্য করে যেতে হবে নীরবে। অন্যকে বিলিয়ে দেওয়ার নামই বুঝি রাস্তাজীবন!
 
এই ঘোর বিপদে জাহিদ কাকে বলতে যাবে, আমি বোনাস পাইনি; তোমরা অফ যাও আপাতত। বলতে না পারার চোরা বেদনার বংশধরেরা চেপে ধরে তাকে। অগত্যা পকেটে হাত দেয় জাহিদ। মোবাইল ডাটা অন করে ঢুঁ মারে ফেসবুকে। অনলাইন পোর্টালের নিউজ, দেশের জনপ্রিয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মী ছাঁটাই! বুকের বোতাম খুলে সহযাত্রীদের অলক্ষ্যে ওপরের দিকে তাকিয়ে বুকে থুতু দেয় জাহিদ। যেনবা উপরওলার কাছে এই বলে শুকরিয়া জানায়, বোনাস না পাই, চাকরিটা তো আছে! ওপরে তাকালেও জাহিদ আকাশ দেখতে পায় না, তার দৃষ্টি আটকে দিয়েছে বাসের ছাদ!

http://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_Send-Money_728-X-90.gif



http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]