অস্তিত্বহীন ৩ কোম্পানিকে হাজার কোটি টাকা ঋণ

সাইফুল্লাহ আমান

অর্থনীতি

যাচাই-বাছাই ছাড়াই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংক। কোনো ধরনের নিয়ম-কানুন না মেনে

2022-06-13T10:47:17+00:00
2022-06-13T10:47:17+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
অস্তিত্বহীন ৩ কোম্পানিকে হাজার কোটি টাকা ঋণ
সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুন, ২০২২, ১০:৪৭ এএম   (ভিজিট : ৬৯৫)
যাচাই-বাছাই ছাড়াই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংক। কোনো ধরনের নিয়ম-কানুন না মেনে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এ ঋণ ছাড় করেছে ব্যাংকটি। সময়ের আলোর অনুসন্ধানে ঋণ প্রদান করা প্রতিষ্ঠান তিনটির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি ঋণ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনে ছিল না কোনো চেয়ারম্যান বা পরিচালকদের নাম। এমন প্রতিষ্ঠানকে এত টাকা ঋণ দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়ে।

হাউজিং ও রিয়েল এস্টেট কোম্পানির নামে টার্ম লোন হিসেবে ৯৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ঋণ দেয় আইএফআইসি ব্যাংক। এসব ঋণের বিপরীতে কোনো আদায় না থাকায় দায়সহ মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান ও প্রিন্সিপাল শাখার ২০১৯ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের শ্রেণিকৃত ঋণ (সিএল) বিবরণীর তথ্যমতে, রাজ হাউজিং লিমিটেড, সৃষ্টি রিয়েল এস্টেট লিমিটেড এবং কুইক রিয়েল এস্টেট- এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৫ বছরমেয়াদি মোট ৬টি টার্ম লোন হিসাব সৃষ্টি করে ৯৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এসব কোম্পানির অস্তিত্ব আছে কি না, জানতে চাওয়া হয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব নেতাদের কাছে। 

একাধিক রিহ্যাব নেতা এসব প্রতিষ্ঠানের নামও জানেন না বলে সময়ের আলোকে জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রিহাবের এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, ‘বাংলাদেশে যতগুলো হাউজিং ব্যবসার প্রতিষ্ঠান আছে তার সঠিক কোনো হিসাব আমার কাছে নেই। আপনার বলা নামগুলো আমাদের সংগঠনের সদস্যও নয়। সব কোম্পানিই যে সদস্য হবে তেমনও নয়। সংগঠনের বাইরেও অনেক কোম্পানি আছে। আপনার প্রশ্ন পাওয়ার পর আমি খুঁজে দেখেছি, এসব কোম্পানির  নাম আছে কি না আমাদের লিস্টে। আমি পাইনি। এসব কোম্পানিই দেশে ফ্ল্যাট-প্লটের ব্যবসার নামে অন্যায় ও দুর্নীতি করে। এদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিত।’

অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঋণ প্রদান এবং টাকা ছাড়ের বিষয়টি সন্দেহ তৈরি করে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘হাউজিং ব্যবসায় লোন নেওয়ার একটা নিয়ম-কানুন (প্রসিডিউর) আছে। সেই প্রসিডিউর আবার একটু দীর্ঘ। এমন ব্যবসায় লোন হয় ধাপে ধাপে। কিন্তু এই লোনটি একই সঙ্গে তিনটি কোম্পানিকে একবারে এতগুলো টাকা ছাড় করেছে, তা খুবই সন্দেহজনক। আবার কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালকদের নাম-ঠিকানাও নেই। এভাবে কোনো লোন ছাড় করা যায় না। এখানে অসৎ উদ্দেশ্যের প্রতিফলন হয়েছে বলেই মনে হয়।’

ঋণ পাওয়া কোম্পানিগুলোর একটি রাজ হাউজিং লিমিটেড। এই কোম্পানিটি ঋণগ্রহণের জন্য কবরস্থান ও নদীভাঙনে নিশ্চিহ্ন জমি জামানত হিসেবে প্রদান করে। তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় আইএফআইসি ব্যাংকের ৭১১তম সভার কার্যবিবরণীতে দুটি অস্বাভাবিক ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে সৃষ্টি রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের অনুকূলে ৪ বছরমেয়াদি ১৯৯ কোটি টাকার টার্ম লোন রয়েছে। ঋণ আবেদনে কোথাও কোম্পানির পরিচালকদের নাম দেওয়া হয়নি। এই ঋণের বিপরীতে সম্পত্তি জামানত রাখার জন্য ঋণ বিতরণের পর অতিরিক্ত ৬ মাস সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জামানত ছাড়াই লোন ছাড় করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তথ্যমতে, ব্যাংকটির একজন প্রভাবশালী পরিচালক অন্য পরিচালকদের ম্যানেজ করে লোন অনুমোদন করিয়ে নেন তখন। একই সঙ্গে পরিচয় আড়াল করতে কোম্পানিটির পরিচালকের নাম গোপন রাখা হয়েছে।

একইভাবে রাজ হাউজিং লিমিটেডের অনুকূলে ৪ বছরমেয়াদি ৮৪ কোটি টাকার টার্ম লোন অনুমোদন করা হয়। এখানেও কোম্পানির পরিচালকদের নাম কিংবা জামানত কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। পর্ষদ সভায় ঋণের মেয়াদ ৪ বছর অনুমোদন করলেও গুলশান শাখায় ঋণ হিসাব সৃষ্টিকালে সব ক্ষেত্রে ৫ বছর মেয়াদ প্রদান করা হয়েছে।

এসব কোম্পানির ঋণ প্রস্তাবনায় ২৫০টি ফুল ফার্নিশড ডুপ্লেক্স বিল্ডিং নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে। ঋণ প্রদানের পর থেকে কোনো কিস্তিও পরিশোধ করেনি কোম্পানিগুলো। ঋণের বিপরীতে অর্থ উত্তোলনের পর কোম্পানিগুলো প্রস্তাবিত খাতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জামানত হিসেবে যে জমির কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে তা অনেক আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া কবরস্থানের জমিতে ভবন নির্মাণের কথা বলে ঋণ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে জালিয়াতির এসব চিত্র। 

এতে দেখা যায়, ঋণপ্রস্তাব অনুমোদনের সময় অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় বা শাখা থেকে কোনো মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ জেনে-বুঝে অর্থ লোপাটের সুযোগ করে দিয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এসব ঋণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজ হাউজিং লিমিটেডের নামে আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০১৭ সালের ২০ জুন ২০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়, যার হিসাব নম্বর-১১৭০৬২০০০০০০১। এর দুমাস পর ২২ আগস্ট একই শাখা থেকে ৬০ কোটি টাকা ছাড় করা হয় রাজ হাউজিংয়ের অন্য একটি হিসাবে (নং-১১৭০৮২৭০০০০০০১)। গুলশান শাখা থেকে রাজ হাউজিংয়ের হিসাব নং-১১৭১১০১০০০০০১-এর অধীনে আরও ৮৪ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে একই বছরের ১৯ অক্টোবর।

ব্যাংকের একই শাখা থেকে সৃষ্টি রিয়েল এস্টেট লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির দুটি হিসাবে (যথাক্রমে ১১৭১০২৩০০০০০১ ও ১১৯০৩২৭০০০০০১) ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর ১৬০ কোটি এবং ২০১৯ সালের ২০ মার্চ আরও ৯৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এ ছাড়া কুইক রিয়েল এস্টেট নামে অন্য একটি কোম্পানিকে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখা থেকে ৩৪৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়, যার হিসাব নম্বর-১১৭১২২৪০০০০০১। উল্লিখিত হিসাব নম্বরগুলোতে ছাড়কৃত মোট ঋণের পরিমাণ ৯৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

হাউজিং ব্যবসায় কীভাবে লোন প্রদান করা হয় জানতে গ্রাহক সেজে আইএফআইসি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘প্রথমত লোন যাচাই করা হয়। এরপর মর্টগেজ যাচাই করা, কোম্পানি যাচাই করা, প্রজেক্টস্থল পরিদর্শন করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে কাজ অনুযায়ী টাকা ছাড় করা হয়। যেমন- জমি ক্রয় করা কিংবা মাটি ভরাট, ভবনের ফাউন্ডেশন দেওয়া, ভবন নির্মাণ, অন্যান্য বিষয় মিলিয়ে কয়েক ধাপে টাকা ছাড় দেওয়া হয়।’

এত কিছু করে ব্যাংক থেকে টাকা ছাড় পায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একই ব্যাংক থেকে তিনটি কোম্পানিকে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া পর্যায়ক্রমে টাকা ছাড়ের পরিবর্তে একসঙ্গে এতগুলো টাকা ছাড় করা হয়েছে কীভাবে- সে প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি আইএফআইসি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ঋণপ্রদান কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে কোম্পানির নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হলে এ নিয়ে কোনো কথা বলতে অপারগতা জানান তিনি। এই কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, ‘কিছু বিষয় আমাদের হাতে থাকে না। প্লিজ ভাই, আমি শুধু চাকরি করি। আপনি এসব বিষয়ে আমাকে জড়ালে চাকরি থাকবে না। আমি কিছু জানি না’- বলে ফোনকল কেটে দেন তিনি।

অস্তিত্বহীন এসব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মাদ শাহ আলম সরোয়ারের সঙ্গে। তার ব্যক্তিগত ফোন নম্বর এবং হোয়াটস অ্যাপে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ই-মেইলও করা হয় তার কাছে। সেখানেও কোনো উত্তর দেননি তিনি। এরপর হোয়াটস অ্যাপে প্রশ্নগুলো লিখে পাঠালে দেখেও কোনো জবাব দেননি। 

পরবর্তী সময়ে আবার যোগাযোগ করা হলে শাহ আলম সারোয়ার বলেন, ‘গ্রাহকের কোনো গোপনীয় তথ্য (কনফিডেন্সিয়াল ইনফরমেশন) আমরা প্রকাশ (ডিসক্লোজ) করব না।’ ব্যাংকের ১ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের বিষয়ে জিজ্ঞাস করলে আর কোনো উত্তর দেননি তিনি।

/জেডও



Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: