ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১ জুলাই ২০২২ ১৭ আষাঢ় ১৪২৯
ই-পেপার শুক্রবার ১ জুলাই ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার: সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ছে
মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন
প্রকাশ: রোববার, ২২ মে, ২০২২, ৯:২৫ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 132

দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া থামছেই না। লাগাম টেনে ধরেও থামানো যাচ্ছে না। কেউ কেউ বলছে লাগামহীন ঘোড়া। কেউ কেউ বলছে বেপরোয়া গতিতে চলছে নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি। সব মিলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস। মানুষ আর চাপ নিতে পারছে না। চাপে চাপে চ্যাপ্টা-প্রায়। সয়াবিন তেলের তেলেসমাতিতে দিশেহারা। তেলহীন তরকারি রান্না করার কথা ভাবছে সাধারণ মানুষ। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের অবস্থা নাজেহাল। তারা না পারছে তেল কিনতে, না পারছে জীবন চালাতে। 

সয়াবিন তেলের এই কারসাজি সরকারকেও ফেলেছে মহাবিপাকে। নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো চেষ্টাই কাজে আসছে না। বলা যায় একটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বেড়াজালে আটকে আছে সয়াবিন তেলের মূল্য। পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকা। ক্ষেত্রবিশেষে এগারোশ-সাড়ে এগারোশ টাকা। কদিন আগেও এক লিটার সয়াবিন তেল ছিল ৮০ টাকা। 

হঠাৎ করে সয়াবিন তেলের বাজারে আগুন লাগাটা সরকারকে বিব্রত করছে। বিপাকে ফেলছে। শত চেষ্টার পরও সরকার এই বিব্রতকর অবস্থা হতে পরিত্রাণ পাচ্ছে না। দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রের হোতারা দিব্যি ব্যবসা করছে। ছিনিয়ে নিচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, যা একধরনের ছিনতাই কিংবা ডাকাতি। পুকুর চুরিও বলা যায়। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের হাতে জিম্মি। তেল সিন্ডিকেটের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন সাধারণ মানুষ।

সরকার সয়াবিন তেলের বিকল্প হিসেবে সরিষার তেল ব্যবহার করার কথা বলছে। পরামর্শটা মন্দ নয়। একসময় বাংলাদেশের মানুষ সারা বছর সরিষার তেল খেত। ঘানিতে ভাঙানো সরিষার তেলের আমেজটাই ছিল অন্যরকম। গ্রামেগঞ্জে ব্যাপক হারে সরিষা চাষ হতো। তা দিয়ে চলত সারা বছর। সয়াবিন তেলের নাম মানুষ তখন খুব একটা জানত না। আস্তে আস্তে সয়াবিন তেল কীভাবে যেন সরিষার তেলের স্থানটা দখল করে ফেলে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সয়াবিন তেলে অভ্যস্ত হয়ে যায়। শুরুতে সয়াবিন তেল বিক্রি হতো প্রতি সের মাত্র ২০ টাকা। বাঁশের তৈরি চোঙ্গা দিয়ে মেপে বিক্রি করা হতো সয়াবিন তেল। ২০ টাকা সেরের সয়াবিন তেল সময়ের ব্যবধানে দুশ টাকা লিটার। একটা মাত্র শূন্য বেড়েছে। এই শূন্যটাই সাধারণ মানুষের জীবন শূন্য করে দিচ্ছে। মানুষ অস্থির। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে তাদের নাভিশ্বাস। চরম সময় অতিক্রম করছে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কোনো রকম জীবনটা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে মানুষের জীবন। সময়ের চাপে নাকাল সাধারণ মানুষ। 

সয়াবিন তেলের পাশাপাশি বেড়েছে আটার দাম। ২৫ টাকা কেজির আটা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা। প্রায় অর্ধেক বেড়েছে। সামনে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়া থেকে গম আসছে না। ইউক্রেন থেকে আসছে না গম, ভুট্টা, সয়াবিন ইত্যাদি। এ রকম চলতে থাকলে সামনের দিনগুলো আরও ভয়াবহ হবে। সারা বিশ্বেই খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অবস্থা হবে ভয়াবহ। 
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা এখন আর দুই দেশের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। আস্তে আস্তে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে এর প্রভাব। বাংলাদেশেও লেগেছে হাওয়া। সেই হাওয়ার সঙ্গে আরও হাওয়া যুক্ত করছে কেউ কেউ। নানা রকম সিন্ডিকেট সারাক্ষণ ওঁৎ পেতে থাকে। কোনো সুযোগ পেলেই বসিয়ে দেয় এক ঘা। বিপাকে পড়ে সরকার। দেশের মানুষ মোকাবিলা করে কঠোর পরিস্থিতি। 

টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে একটার পর একটা দ্রব্য নিয়ে চলছে নানা রকম তেলেসমাতি। কখনও পেঁয়াজ, কখনও তেল, কখনও চাল-ডাল। যখন যেটাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করা যায়। অসাধু কিছু ব্যবসায়ীর ব্যবসার ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন যায়-যায়। সীমিত আয়ের মানুষদের জীবন চলছেই না। 
তারপরও মানুষ অসীম ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করছে। সরকার যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে তা হলে দেশের মানুষ বেঁচে যাবে। খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে নেমে আসবে স্থিরতা। 

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সমাজে একটা অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। মানুষ না পারছে বলতে, না পারছে সইতে। অনেকটাই বোবার মতো। হার্টের ওপর চাপ পড়ছে। তারপরও নীরবে সহ্য করছে। বলা যায় মানুষের সহ্যক্ষমতা অনেক বেড়েছে। কিন্তু দিন শেষে উচ্চ রক্তচাপের চাপটা ভোগাচ্ছে তাদেরকে। বাজারে গেলেই সবার মাথা গরম। মাথায় রক্ত উঠে যায়। হার্টে চাপ লাগে।

গরম মাথা নিয়ে আর যাই হোক জীবন চালানো যায় না। তারপরও চালাতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হচ্ছে যন্ত্রণা। এক টাকার জিনিস পাঁচ টাকা দাম নিলেও নীরবে মেনে নিচ্ছে মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের মেনে নেওয়ার ক্ষমতা আসলেই বেড়েছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তারপরও তারা মানছে। চাল-ডাল, তেল, নুন, পেঁয়াজ কিনতে পারছে না। তারপরও মানছে। সয়াবিন তেলের দাম বাড়তে বাড়তে চূড়ায় পৌঁছে গেছে, তারপরও মানছে। সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। মন্ত্রী-এমপিরা নাওয়া-খাওয়া, ঘুম হারাম করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিভিন্ন রকম সিন্ডিকেটের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। সিন্ডিকেট ভাঙার নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। ভাঙতে পারছেন না। কোনো এক অজানা কারণে ব্যবসায়ীরা সরকারকে সহায়তা করছেন না। দ্রব্যমূল্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আগুনখেলা খেলছে। বোঝা যাচ্ছে এই খেলায় কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের ইন্ধন আছে। দল বা দলগুলো সরকারকে বিপাকে ফেলতেই ব্যবসায়ীদের ভুলপথে চলতে উৎসাহিত করছে। শক্তি-সাহস মনোবল জোগাচ্ছে। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করছে। দেশের কথা দেশের মানুষের কথা চিন্তা না করে করছে অপকর্ম। লোক ঠকানোর মতো জঘন্যতম কাজ। মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলার মতো ঘৃণ্য কাজ। জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে উৎসাহিত করার চেয়ে জঘন্য কাজ আর কী আছে? 

সরকারি দল বিরোধী দল সবাইকেই দেশের মানুষ নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে সাধারণ মানুষের জীবন ধারণ নিয়ে। যে যত বেশি মানুষ নিয়ে ভাবে সে তত বেশি মানুষের কাছের মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোর মানুষ নিয়ে ভাবনাটা তাই জরুরি। ক্রমাগত জিনিসের দাম বাড়লে এই ভাবনার কোনো দাম থাকে না। এতে সরকারি দলের ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও বাধা হয়। বিরোধী দলের ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়। যার কারণে সরকারি দল বিরোধী দল উভয়ে মিলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তা না করতে পারলে সাধারণ মানুষ উভয়ের ওপর থেকে আস্থা হারাবে। বিরোধী দলের কাজ হলো বিভিন্ন সমস্যা সঙ্কট সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক সাবধান করা। সঙ্কট উত্তরণের পথ বাতলে দেওয়া। সঙ্কট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, পর্যালোচনা করা।
 
বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন সঙ্কট নিয়ে কোনো কথাই বলে না। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে কোনো কথা বলেছে তা নজরে আসেনি। অথচ সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়ানো বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা বলা উচিত ছিল। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে দ্রব্যমূল্যের বিষয়ে সরকারকে নানা পরামর্শ দেওয়া উচিত ছিল। দলটি সে উচিত কাজটি করতে পারেনি। এখনও পারছে না। যার কারণে দেশের মানুষ দলটির প্রতি আস্থা কিংবা ভরসা কোনোটাই রাখতে পারছে না। 

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন গতি মানুষের জীবন ধারণকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মানুষের মাঝে সারাক্ষণ একটা হতাশা-দুশ্চিন্তা কাজ করছে। বাজারে গেলেই হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক-মানসিক রোগে। ডাক্তাররা বিষয়টার সুন্দর ও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। তবে হ্যাঁ, যেকোনো পেরেশানি মানুষের হার্টবিট ও উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ বলে চিকিৎসাশাস্ত্রে উল্লেখ আছে। তাই বলা যায় উচ্চ দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের একটা সম্পর্ক আছে। সয়াবিন তেল নিয়ে যে তেলেসমাতি চলছে তা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে আরও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। পীড়া দিচ্ছে। মনোযন্ত্রণা বাড়াচ্ছে। যে করেই হোক দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা সরকারকে করতেই হবে। দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব যেহেতু সরকারের, সেহেতু চেষ্টাটাও সরকারকেই করতে হবে। বর্তমান সরকার সারাক্ষণ সে চেষ্টাই করছে। নানা মহলের অসহযোগিতার কারণে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। দেশের সাধারণ মানুষ আশা করছে সময় আসবেই। দিন বদলাবেই। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবেই। 

লেখক: সাবেক খণ্ডকালীন শিক্ষক 
    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

/জেডও

http://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_Send-Money_728-X-90.gif



http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]