ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১ জুলাই ২০২২ ১৭ আষাঢ় ১৪২৯
ই-পেপার শুক্রবার ১ জুলাই ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

কে বলেছে মাগো তুমি অচ্ছুত
দীপংকর গৌতম
প্রকাশ: রোববার, ২২ মে, ২০২২, ৯:১৯ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 102

গোপীবাগ রাজধানী মার্কেটের দেয়াল ঘেঁষে একটি টং দোকানের পাশে অজস্র মায়ের ভিড়। বিভিন্ন বয়সি মায়েরা রঙিন শাড়ি আর সিঁদুরে যেন বিবর্ণ সকালে রঙ ছড়াচ্ছিল। এদের সবার হাতে গ্লাস। চায়ের দোকানদার দূর থেকে তাদের গ্লাসে চা ঢালছে। এরা কেন গ্লাস নিয়ে এসেছে, জানতে চাইলে দোকানি জানাল, এরা তো সুইপার। 

এদের থেকে টাকা কম নেওয়া হয় না, চায়ের পরিমাণও সবার মতো দেওয়া হয়, তারপরও এরা অচ্ছুত। দোকানের কাপে এদের চা খাওয়ার অধিকার নেই। এরা ও তাদের সন্তানরা আমাদের জীবনযাপন আরামদায়ক, পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর করে অথচ তারাই অচ্ছুত! 

প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে সারা দেশের শহরগুলো যারা ঝেড়ে-মুছে ঝকঝকে তকতকে করে রাখে, যারা আমাদের শরীরের বর্জ্য সাফ করে আধুনিক নগরায়ণকে গতিশীল করে। সহজ বাংলায় এদের পরিচ্ছন্নতা কর্মী বলা হলেও এরা সুইপার নামেই পরিচিত এবং অবহেলিত সমাজে সবার কাছে। সমাজের গরল সাফ করা এসব মানুষ ব্রিটিশ আমলে কানপুর, দক্ষিণ ভারত থেকে এসেছিল এ দেশে রুটি-রুজির অন্বেষণে। কিন্তু ধর্ম-কর্মের বেড়াজাল ডিঙিয়ে এরা এগোতে পারেনি এখনও। সমাজে এরা মানুষ হয়েও ‘অচ্ছুৎ’। ভারতের বাপুজি মহাত্মা গান্ধী এদের ভগবানের প্রিয়পাত্র হিসেবে ঘোষণা করে নাম দেন ‘হরিজন’। কিন্তু সমাজ সামাজিকতায় এদের অবস্থান অচ্ছুত, দলিত। হরিজন পল্লীর বাসিন্দারা তাদের পল্লীতেই দিন যাপন করেন। বর্তমান সরকার তাদের অনগ্রসর দলিত সম্প্রদায়ে অধিভুক্ত করলেও কালের বিবর্তনে কেবল তাদের নাম ও পরিচয়ের হেরফেরই হয়েছে, সে অর্থে ভাগ্য, সম্মান এবং অবস্থানের আজও কোনো পরিবর্তন হয়নি তাদের সমাজে এবং আমাদের কাছে। সামাজিক মর্যাদা বলতে যা বোঝায়, তার কিছুই নেই এ জনগোষ্ঠীর।

তাদের পল্লীতে গেলে মনে হবে দেশের মধ্যে এ কোন এলাকা! ব্রিটিশ আমলে করা পল্লী তেমনই আছে। ছোট ছোট খুপরি ঘর, তার মধ্যেই আদিমভাবে জীবনযাপন করে বেঁচে থাকে হরিজনেরা কোনো রকম। ব্রিটিশরা দেশ থেকে চলে গেলেও সুইপার কলোনির এলাকা আর বাড়েনি। অতটুকু ঘরে কাপড়ের ঘের দিয়ে শম্ভুনাথ তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে থাকেন কোনোমতে। বাসস্থান বলতে এই পল্লী। বৃষ্টির দিনে জল পড়ে। গরমে অসহ্য গরম। একটু বাতাস ঢোকে না। শম্ভুনাথ বলেন, এ চাকরি ছাড়লে তো জায়গা হাতছাড়া হবে, তখন কোথায় যাব? কথা হয় রানার সঙ্গে। তিনি একটা এনজিওতে কাজ করেন। 

তিনি বলেন, এখানে শিক্ষা-স্বাস্থ্য বলে কিছু নেই। মেয়েরা সবচেয়ে কষ্টে থাকে। এখানের পুরুষরা রাতে চুল্লু (এক ধরনের দেশি মদ) খেয়ে এসে বউকে মারবে, এটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বর্তমানে নারীরা সংগঠিত হয়ে এটা কমিয়েছে অনেকটাই। এসব নারীর শক্তি এখন ৯৯৯। বেশি ঝামেলা করলেই ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকে। পথে-ঘাটে তাদের প্রতি টিজ করাও কমেছে ৯৯৯-এর বদৌলতে। তবে এ জনগোষ্ঠীর নারীরা জানান, এখনও তাদের কেউ ঘরে ঢুকতে দেয় না। অচ্ছুত বলে প্রায় ক্ষেত্রেই যথাযথ চিকিৎসা পাওয়া যায় না। এই কলোনিতে প্রায় চার হাজার মানুষের বসবাস। এখানে ট্যাপ মাত্র ৫টা। টয়লেট ৫টা। যখন জল আসে, শুরু হয় মেয়েদের দৌড়। বালতির জলের ঢেউয়ে ভিজে যায় পুরো পল্লী। এই জল সহসা শুকায় না। পুরনো পল্লীর ভ্যাপসা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং এ পল্লীর নিত্যসঙ্গী বাংলা মদের কারণে এখানের পুরুষরা অল্প বয়সেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। মারাও যায় দ্রুত। তাই বিধবার সংখ্যাও বেশি এ পল্লীতে। বিধবাদের এখানে অনেক ঝামেলা সহ্য করতে হয়। শিক্ষা বলতে এখানে এনজিওর স্কুল। চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানসহ নানা সঙ্কটে যেন না মরে বেঁচে আছেন এ পল্লীর বাসিন্দারা। 

সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব দিক থেকে তারা পিছিয়ে, অথচ গাবতলী বা স্বামীবাগ মিলে এ জনগোষ্ঠীর শিল্পীর সংখ্যা অনেক। কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী সবই তাদের আছে। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগ নেই বলে সুইপার কলোনির শিল্পীদের বিকাশ নেই। তাদের জীবনের এসব কাহিনি কাউকে বলার নেই, যদিও তারা অনেকেই ভোটার। এ দেশেরই নাগরিক তারা।

শহরের ময়লা-আবর্জনা সাফ করার অসাধ্য কাজটি করলেও তারা এখনও এ সমাজেরই বঞ্চিত জনগোষ্ঠী। তবে আশার কথা হলো, এ জনগোষ্ঠীর কিছু ছেলেমেয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে লক্ষ্মী রানী। তিনি বলেন, তারা ছোট থাকতে দেখছেন, তাদের মা-মাসিকে কোনো হিন্দু ঘরে বা মন্দিরের কাছেও যেতে দিত না। তারা গ্লাস নিয়ে না গেলে সবার কাপে চাও দেওয়া হয় না। এত বঞ্চনা দেখতে দেখতে প্রতিবন্ধী হয়ে যেতে হয়। স্কুল-কলেজে ভর্তির সময় তারা পরিচয় লুকিয়েছে। নতুবা ভর্তি করতেও চাইত না স্কুল তাদের। 

এ জনগোষ্ঠীর পুরুষরা কোনোভাবে দিন কাটালেও সঙ্কটে থাকে নারীরা। রাস্তাঘাটে নারীদের ডাকা হয় অবহেলা করে। যত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সুইপার কলোনির একটা মেয়ে এবং বউকে জীবন সংগ্রাম করতে হয়, এমন সংগ্রাম বোধহয় আর কাউকে করতে হয় না। একটা মেয়ে বিধবা হলে, জীবন বাঁচাতে যে কারও বাসায় কাজ করে খাবে, তার সুযোগও নেই। কারণ এরা অস্পৃশ্য। বেকারত্ব এখানের সবচেয়ে বড় সমস্যা। সুইপার কলোনির কাউকে কাজে রাখা যায় না। শিক্ষিত হলেও না। এখানকার ছেলেমেয়েরা এনজিওর স্কুলে প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পার করলে সঙ্কটে পড়ে। সব লুকানো গেলেও কেউ কি তার ভাষা-সংস্কৃতি লুকাতে পারে? তা ছাড়া একটা সভ্য সমাজে তা লুকাতেই হবে কেন? 

এ পল্লীর মানুষের  সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এ পল্লীতে কোনো শিশুকে আসতে দেওয়া হয় না। এরা বাইরের শিশুদের ছুঁলে জাত যাবে, এমন ভাবা হয়। অথচ এ পল্লীর অনেক মা-মেয়েই সন্তান প্রসবে চৌকস ধাত্রীর কাজ করে। এ জনগোষ্ঠীর মানুষ শিক্ষিত হলেও চাকরি কঠিন, যদিও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতা কর্মীর চাকরি বংশগতভাবে তাদের অগ্রাধিকার। কিন্তু গোপনে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ হরিজনের সার্টিফিকেট নিয়ে মূল হরিজনদের চাকরি নিয়ে নিচ্ছে- এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রায়ই। এতে করে বংশগতভাবে যারা হরিজন, তারা ঠকছে চাকরি প্রাপ্তির এ সুযোগ থেকে। বঞ্চনা যেন তাদের পিছু ছাড়ে না। হরিজনদের ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চাকরি না পেয়ে পিতামাতার কাজে সহায়তা করতে করতে সেও সুইপার বনে যায়। মুক্তি মেলে না তাদের। লেখাপড়া জানলেও তারা অচ্ছুৎ। কোনো অনুষ্ঠান, উৎসবে তাদের কেউ ডাকে না। তাদের বাড়িতেও কেউ আসে না। পরিচ্ছন্নতায় তারা পিছিয়ে নেই। তবুও জাত-পাতের বেড়াজালে তাদের আটকে রাখে আমাদের সভ্য সমাজ। আশা রানী জানান, তিনি কলেজে পড়লেও তাকে মানসিক অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়, যদিও তার মা-মাসিদের সময়ের চেয়ে পরিস্থিতি এখন অনেক বদলেছে। যদিও এদের জীবনের অনগ্রসর দিকটি দেখিয়ে বহু সংগঠন, এনজিও অনুদান আনলেও তাদের জীবন পাল্টানোর ব্যবস্থা ব্যাপক অর্থে সেভাবে নেই। সরকারি উল্লেখযোগ্য কোনো অনুদান বরাদ্দ নেই এ জনগোষ্ঠীর জন্য। তবে সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এদের উন্নয়নে কাজ করতে। 

বাংলাদেশের সুইপার কলোনি, ঋষি কলোনি, বাঁশফোড় কলোনির নামের সঙ্গে যেন মিশে আছে অচ্ছুত বিষয়টি। ঈদ-পূজায় ওদের কেউ দাওয়াত করে না, ওরা পূজায় দাওয়াত করলে কেউ ওদের পল্লীতে আসে না। কোথাও বেড়ানোর সুযোগ নেই তাদের। কার কাছে যাবে তারা? সবখানে ওরা অচ্ছুৎ। অন্তহীন অভিযোগ নিয়ে যুগ যুগ ধরে বাস করছে দলিত সম্প্রদায়ের এসব মানুষ। অনগ্রসর এ জনগোষ্ঠীকে আলোর পথে আনার কোনো সামাজিক আন্দোলনও নেই সে অর্থে। এই একবিংশ শতাব্দীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যদি ‘দলিত’ শব্দটি উচ্চারণ করতে হয় আমাদের এখনও, সেটা আমাদেরই অনগ্রসরতা। 

এই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করেছে আমাদের বাংলাদেশ। এখনও মানুষকে বিভাজনের জালে বন্দি করে রাখলে আমাদের মানবিক উন্নয়ন আর কবে ঘটবে? এজন্য সরকারের সুদৃষ্টির সঙ্গে প্রয়োজন একটি বিশাল সামাজিক আন্দোলন। 

এমন একটি সমাজের স্বপ্ন হোক আমাদের অঙ্গীকার, যেখানে থাকবে না কোনো সম্প্রদায় বিভাজন, যেখানে মানুষ বলতে সবাই বুঝবে শুধু মানুষ,  ‘অচ্ছুত’ বলে কোনো শব্দ থাকবে না আমাদের মনে এবং সমাজে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

/জেডও

http://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_Send-Money_728-X-90.gif

আরও সংবাদ   বিষয়:  অচ্ছুত  




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]