সম্প্রতি শেষ হওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলেও এই নির্বাচনের মতো জাতীয় নির্বাচন করা সম্ভব না। মাথায় রাখতে হবে জাতীয় নির্বাচন আর সিটি নির্বাচন এক বিষয় নয়। নাসিক নির্বাচন ভালো হয়েছে বলে জাতীয় নির্বাচনও ভালো হবে-এ ধারণা ভুল।
শনিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত 'সদ্য সমাপ্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন : জনপ্রতিনিধি নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং অভিজ্ঞতা' শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান।
সংলাপে অংশ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে সব সময় একটা ক্ষমতার দ্ব›দ্ব ছিল। যদি আমরা পেছনের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে ২০১১ সালের নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন এমন একটা পরিস্থিতিতে হয়েছিল সে সময় সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে গিয়েছে। আর সেই সময়ে সাধারণ মানুষ একজন সৎ, যোগ্য ও শান্তিপ্রিয় নেতৃত্ব চেয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভী সেখানে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, যেহেতু নারায়ণগঞ্জের মানুষ অধিকাংশই খেটে খাওয়া ও ব্যবসায়ী; তাই তারা একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায়। আর এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য তারা বারবার আইভীকে বেছে নিয়েছে। নাসিক নির্বাচন সুষ্ঠু সুন্দর হয়েছে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছ ভূমিকা এবং প্রার্থীদের শান্তিপূর্ণ আচরণ। তবে মাথায় রাখতে হবে যে নাসিক নির্বাচন জাতীয় নির্বাচন নয়। অনেকেই ভাবে নাসিক নির্বাচন ভালো হয়েছে তাহলে কেন জাতীয় নির্বাচন ভালো হবে না- এ ধারণা ভুল। কেননা এই নির্বাচন সরকারকে সরাতে সহায়তা করে না। সরকার এই নির্বাচনে তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি কারণ সেখানে সরকার প্রায় নিশ্চিত ছিল যে তাদের প্রার্থী সেখানে জয়ী হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের সবকটি উপাদান ছিল নাসিক নির্বাচনে। তবে এই উপাদানগুলো জাতীয় নির্বাচনে না-ও থাকতে পারে।
সংলাপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, 'আমি মনে করি এই ইভিএম জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার করা উচিত না। তবে সব কিছুর ওপর সম্প্রতি যে নির্বাচনগুলো হচ্ছে তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন শিক্ষণীয়। তবে আমাদের ইভিএম থেকে সচেতন থাকা দরকার। '
মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, 'একটি নির্বাচনের মূল অংশীজন নির্বাচন কমিশন ও প্রার্থীরা। আমরা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখলাম একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন এমন কোনো আচরণ করেনি যাতে করে নির্বাচন খারাপ হয়। সরকার ও প্রশাসনও এমন কোনো আচরণ করেনি যাতে করে নির্বাচন খারাপ হয়। প্রার্থীরা অসৎ আচরণ করেনি। গ্রেফতারের কিছু অভিযোগ থাকলেও তা বিশেষ কোনো অভিযোগ আকারে আমাদের চোখে পড়েনি। নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য হয়নি। এটি একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ছিল না। আমরা সম্প্রতি খুলনা ও গাজীপুরে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন দেখেছি। সংঘাত হয়েছিল রাতে ব্যালট বাক্স ভরা হয়েছিল। এই নির্বাচনকে সরকার প্রভাবিত করেনি। কারণ তারা দেখছিল কোনো প্রভাব ছাড়াই এখানে আইভী জিততে পারে। আর এটি একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এতে সরকার পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। '
'তৈমূর আলম খন্দকার ইভিএম নিয়ে নানা অভিযোগ তুলেছে। তবে আমাদের এই ইভিএম মেশিনটি হচ্ছে একটি নিকৃষ্ট মানের ইভিএম মেশিন। যেখানে পুনরায় গণনা করার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ প্রার্থী যদি চায় তাহলে ভোট গণনা করতে পারবে না।
তিনি আরো বলেন, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনকে সরকার কাজে লাগাতে চেয়েছে। কারণ তারা যে বার্তাটি দিতে চেয়েছিল যে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে- এই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সেই বার্তাটি দিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ এই বার্তাটি সঠিকভাবে নিয়েছে কি না তাতে অনেক সন্দেহ রয়েছে।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো সেলিনা হায়াৎ আইভী জয়লাভ করেছে তার ব্যক্তিগত ইমেজ ও দলীয় ইমেজের কারণে। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে অনেক অভিযোগ আছে তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সব অভিযোগে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে একটি আনন্দিত পরিবেশে, নিরাপদ ব্যবস্থাপনায়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন হওয়া সম্ভব।
ইভিএম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৈমূর সাহেব অভিযোগ করেছেন ইভিএমে কারচুপি হয়েছে- আমি এটা কোনোভাবেই বিশ্বাস করি না। তবে ইভিএমের অনেক সমস্যা আছে যেমন সেলিনা হায়াৎ আইভীও বললেন যে ইভিএম এর কারণে তার অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেনি।
তৈমূর আলম খন্দকারের প্রতি অবিচার হয়েছে উল্লেখ করে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, নাসিক নির্বাচনের পর আপনারা দেখেছেন যে তারা তৈমূর আলম খন্দকারকে বিএনপির থেকে বহিষ্কার করেছে। তারা কিন্তু চাইলে তাকে নির্বাচনের আগে বহিষ্কার করতে পারত। কিন্তু করেনি কারণ যদি কোনোভাবে নির্বাচনে তিনি জিততেন তাহলে তাকে তারা দলে ফেরাতেন। আমার কাছে মনে হয় এটি তার প্রতি অবিচার হয়েছে। একটা বড় দল হিসেবে তা করা উচিত হয়নি, একটা বড় দলের কাছে এটা আশা করা যায় না।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতীক হয়ে উঠেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি আজ দুপুরে সিপিডির এক ভার্চুয়াল সংলাপে এমন মন্তব্য করেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, 'নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটা ইউনিক বিষয়। এটা অন্য নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে তুলনা করা যায় না।
রুমিন ফারহানা বলেন, 'এই নির্বাচন থেকে একটা বিষয় খুবই পরিষ্কার যে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের মতো পর্যায়ে আমরা এখনো পৌঁছইনি'।
তিনি বলেন, এই নির্বাচনকে ঘিরে আশঙ্কা যেমন ছিল, আশার দিকও ছিল। সরকার চেয়েছিল এই নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করতে। সরকার চেয়েছিল এই নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। কারণ সব দিকেই সরকারের লাভ। সরকার জানত যে সেলিনা হায়াৎ আইভী এমন একজন প্রার্থী, যার হারার কোনো সম্ভাবনা নেই বা খুবই কম। এ ছাড়া এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার দেখাতে চাইবে সামনে যে জাতীয় নির্বাচন আসছে তা দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু হতে পারে।
সংলাপে অংশ নিয়ে এবারের নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন খুবই ষড়যন্ত্রমূলক ছিল বলে মন্তব্য করেছেন তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হওয়া আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। বলেছেন, চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে তাকে। গত ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের ভোটে নৌকা প্রতীকে আইভী ৬৬ হাজার ৯৩১ ভোটে মেয়র হিসেবে টানা তৃতীয়বার জয় পান।
আইভী বলেন, ‘এবারের নির্বাচন কঠিন ছিল। তিনটি মেয়র নির্বাচন করেছি। তিন নির্বাচনের ফ্লেভার তিন রকম ছিল। কোনো নির্বাচনেই ষড়যন্ত্রের বাইরে ছিলাম না। সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে নির্বাচন করেছি। যদিও আমার দল আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল, কিন্তু প্রতিবারই বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়ে সাধারণ জনগণকে আস্থায় এনে নির্বাচনে জিততে হয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জে সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গটি ইঙ্গিত করে আইভী জানান, তার কোনো বাহিনী নেই। অনেক বাধা এসেছে, এমনকি তাকে হত্যার প্রচেষ্টাও করা হয়েছে। এরপরও কখনই বাহিনী তৈরি করেননি।
ইভিএমে ভোট কম পড়েছে বলে জানালেন আইভী। তিনি বলেন, ‘ইভিএমের কারণে ভোট কমেছে, এটা সত্য। এমন না যে ভোটাররা ভোট দিতে আসেননি। আমার অসংখ্য ভোটার ফেরত গেছে।’
সংলাপে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বদিউল আলম মজুমদার, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন, সংসদ সদস্য আরোমা দত্ত ও রাশেদ খান মেনন।
এফএইচ