ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২ ৩ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

কারাগারে বসেই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ প্রতারক শামীমের
এসএম মিন্টু
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২১, ১:০৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 295

প্রতারণা মামলায় শামীম ভূইয়া সস্ত্রীক কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে প্রতারণার ২৩ মামলা থাকলেও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখনও গ্রেফতার হয়নি। তবে কারাগারে বসেই ওই সিন্ডিকেটের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রতারক শামীম। এখন ফন্দি আঁটছেন ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা দিয়ে হয়রানি করার। এমন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও ভুক্তভোগীরা। প্রতারক শামীম চক্রের নারী সদস্য ময়না (৩০), শামীমের ভাই হান্নান ভূইয়া, এনাম আহমেদ ও খলিল এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ছাড়াও শামীমের বিরুদ্ধে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ইতালির ভিসাসহ অসংখ্য ভুয়া কাগজপত্রের তথ্য পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি প্রতারক শামীমকে নিয়ে সময়ের আলো পত্রিকায় একাধিক রিপোর্ট প্রকাশের পর গত ১৮ নভেম্বর শামীম ভূইয়া ও তার স্ত্রী সালমা ভূইয়া ওরফে দাদিসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। অন্য আসামিরা হলেন- এসএম আনিসুর রহমান, সালাহউদ্দিন ও মো. নাসির উদ্দিন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড চাইলে আদালত প্রত্যেককে দুদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে আদালতে ফের রিমান্ড চাইলে আদালত আসামিদের কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গতকাল সালমা ভূঁইয়াকে গাজীপুরে কাশিমপুর কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এই মামলার অন্য আসামিকে গত শনিবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (কেরানীগঞ্জ) জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ভুক্তভোগী একেএম শিহাবউদ্দিন জানান, প্রতারক শামীম ভূঁইয়া কারাগারে থাকলেও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখনও বাইরে রয়েছে। শামীম ভূঁইয়ার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তিনিসহ নয়জন ব্যবসায়ী এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভুক্তভোগীদের সবার বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বিভিন্ন থানায় মামলা করেছেন। এমনকি টাকা পরিশোধের কথা বলে বাসায় ডেকে নিয়ে নারীদের দিয়ে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে পাওনা টাকার কথা ভুলে যেতে বলেন। একেএম শিহাবউদ্দিন আরও জানান, শামীমের প্রতারক চক্রটি ঢাকার থানাগুলোতে মিথ্যা মামলা না দিতে পেরে এখন আদালতে নারী নির্যাতনের মামলার জন্য চেষ্টা করছে বলে তিনি তথ্য পেয়েছেন। আর এ কাজে সহযোগিতা করছে প্রতারণা মামলার পলাতক আসামি ময়না। ময়না এর আগেও মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলার ভয় দেখিয়েছে। শামীম কারাগারে বসেও তার সিন্ডিকেটের সদস্যদের সক্রিয় রাখছেন।

কারাগার সূত্র জানায়, হাতিরঝিল থানার একটি প্রতারণার মামলায় শামীমসহ চারজন কেরানীগঞ্জ কারাগারে আছেন। শামীমকে ও তার সহযোগীদের দেখতে অনেকেই আসেন। সবাই তার স্বজন বলে পরিচয় দিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন।

সূত্র জানায়, কারাগারে বসেই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রতারক শামীম। শামীমের ভাই ও অন্য সদস্যরা মোবাইল ফোনেও যোগাযোগ করছেন কারাগার থেকে। ওই সূত্র আরও জানায়, তার সিন্ডিকেটের নারী সদস্যদের অন্যতম ময়না। এই ময়নার মাধ্যমেই ফাঁদে ফেলে বিভিন্ন অপকর্ম করেছেন শামীম ভূঁইয়া। তবে ময়নাকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

এসব বিষয়ে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার সময়ের আলোকে বলেন, পাঁচজন কারাগারে রয়েছে। এই মামলার আসামি ময়না পলাতক। তাকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার আন্ডারের থানাগুলোতে কোনো মিথ্যা মামলা করার কোনো সুযোগ নেই।

প্রতারণার শিকার আরেক ভুক্তভোগী এসএম ফখরুল ইসলাম। তার প্রতিষ্ঠানের নাম শরীফ ইলেকট্রনিক্স। প্রতারক শামীমসহ অন্যরা বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গিফট সাপ্লাইয়ের অর্ডারের কথা বলে সর্বশেষ তার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। তিনি শামীমকে এখন পর্যন্ত ৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দিয়েছেন। কাজ বা টাকা ফেরত না দেওয়ায় তিনি শামীম সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন খিলগাঁও থানায়। ওই মামলা দেওয়ার পর প্রতারক শামীম বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে উল্টো খিলগাঁও থানায় দুটি মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। আরেকটি মামলা দিয়েছেন পল্টন থানায়।

এসএম ফখরুল ইসলাম আরও বলেন, গত ১৮ নভেম্বর শামীম ভূঁইয়া, তার স্ত্রী সালমা ভূঁইয়াসহ মোট পাঁচজনকে ভুক্তভোগী এক নারীর করা মামলায় গ্রেফতার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। অথচ পল্টন থানা পুলিশ তার বিরুদ্ধে শামীমের করা মামলায় চার্জশিট দিয়েছে গত ২৫ নভেম্বর। একজন প্রতারকের পক্ষ নিয়ে কীভাবে পুলিশ চার্জশিট দিল তা তার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, মামলাটির চার্জশিট দেওয়ার আগে অন্তত পুলিশের উচিত ছিল বিবাদীর স্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ নেওয়া। এমনকি বাদী যখন কারাগারে তখন পুলিশ এই চার্জশিট আদালতে দাখিল করে কীভাবে!
 
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই থোয়াই চানু মারমা তার গ্রামের বাড়িতে সঠিক ঠিকানার জন্য কাগজ পাঠালে ওই থানা থেকে গত শনিবার পর্যন্ত কোনো কাগজ পায়নি পুলিশ। তা হলে কীভাবে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিলেন? মামলাটি যখন প্রতারক শামীম দেন তখন তার ঠিকানা দেওয়া ছিল ৮৬/১ পুরানা পল্টনের। তার প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া ছিল ইসমাইল ট্রেডার্স। অথচ ওই ঠিকানায় ২০১৮ সাল থেকে ওই প্রতিষ্ঠান বা শামীম ভূঁইয়া নামের কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি বিচারের দাবিতে গত রোববার পুলিশ সদর দফতর, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, ডিবির প্রধানসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।

এ বিষয়ে পল্টন থানার এসআই থোয়াই চানু মারমা সময়ের আলোকে বলেন, গত ২৫ নভেম্বর তিনি আদালতে চার্জশিট দিয়েছেন। বাদী প্রতারণা মামলায় গ্রেফতার বিষয়টি তার জানা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাদী কারাগারে না অন্য জায়গায় তা জানার প্রয়োজন নেই। বিবাদীর গ্রামের ঠিকানার কোনো তথ্য হাতে পেয়েছেন কি না এবং বাদীর ভুয়া ঠিকানায় কীভাবে মামলা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভাই সামনাসামনি আসেন কথা হবে।

এসএম ফখরুল ইসলাম আরও বলেন, প্রতারক শামীম সিন্ডিকেটের অন্যতম নারী সদস্য ময়না। শামীমের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ার জেরে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জাহিদুলকে প্রধান আসামি করে গত ২০ আগস্ট খিলগাঁও থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে একটি মিথ্যা মামলা দেন। ওই মামলায় তাকেও আসামি করা হয়। ফখরুল ইসলাম বলেন, ময়নাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন প্রতারক শামীম। ওই মিথ্যা মামলায় তার বন্ধু জাহিদুল ও তিনি জেলও খেটেছেন। তিনি বলেন, খিলগাঁও থানা পুলিশ শামীম-ময়নার যোগসাজশে একই দিনে দুটি মামলা করেন। একটি মামলা পর্নোগ্রাফি যার নম্বর ৪৭ অন্যটি প্রতারণা মামলা নম্বর ৪৮।
 
এদিকে প্রতারক শামীমের বিরুদ্ধে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতিরও অভিযোগ উঠেছে। তার মেশিন রিডেবল পাসপোর্টে দেখা যায় ১৯৯০১২১১৩২৮০৪৪৬০০ নম্বর। আরেকটি এনআইডিতে দেখা যায় ১৯৯০২৬৯০৪২১০০১২৫৫ নম্বর। দেখা গেছে, ২০২০ সালে শামীমের পাসপোর্টে ইতালিয়ান ভিসা লাগানো। ওই ভিসায় তিনি ইতালিতে গেছেন কি না তা নিশ্চিত হয়নি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে ভিসাটি পরীক্ষার জন্য ইমিগ্রেশন পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে সময়ের আলোর অনুসন্ধানে প্রতারক শামীম ও তার স্ত্রীর নামে পুরান ঢাকার শেখসাহেব বাজারে ছয়তলা বাড়ি, বনশ্রীতে ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট, বাড্ডা, আফতাবনগর ও সবুজবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৯টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে।

পুরান ঢাকার শেখসাহেব বাজারের বাড়ির মালিক জুয়েল জানান, প্রতারক শামীম তার বাড়িটি কীভাবে দলিলপত্র করে নিলেন তা তার আজও জানা নেই। তিনি পারিবারিক ও স্থানীয়ভাবে খুব চিন্তিত। কীভাবে ওই প্রতারক তার বাড়ির দলিল করেছে সেই চিন্তায় তার ও তার স্ত্রীর ঘুম নেই। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারক শামীমের সঙ্গে জুয়েলেরও সম্পর্ক রয়েছে। তা না হলে কীভাবে ওই বাড়িটি লিখে নিয়েছে শামীম।




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]