ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১৯ আগস্ট ২০২২ ৪ ভাদ্র ১৪২৯
ই-পেপার শুক্রবার ১৯ আগস্ট ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

যেমন খুশি ফি আদায় চিকিৎসকদের
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: শনিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২১, ৯:০০ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 313

রোগীর কাছ থেকে খেয়ালখুশি মতো ‘ফি আদায়’ করছেন প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা চিকিৎসকরা। সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় বাড়ছে স্বেচ্ছাচারিতা। রোগীরা যেন অসহায়। রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগী দেখার ফি-বাবদ ১ হাজার টাকা বা তার বেশি নিচ্ছেন বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। আর নামিদামি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যারা বসেন তাদের ফি ২০০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

অভিযোগ আছে, চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের বিরোধিতার কারণে আটকে আছে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস ফি নির্ধারণ নীতিমালা। রোগীর কাছ থেকে চিকিৎসকদের ‘ফি’ নির্ধারণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। সেই লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। কিন্তু সেই কমিটি গঠনের পর থেকে একটি মাত্র সভা করা ছাড়া নীতিমালা প্রণয়ন তো দূরের কথা আর কোনো অগ্রগতিই হয়নি। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, পেশাজীবী চিকিৎসক নেতাদের আপত্তির কারণে নীতিমালা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিকিৎসক সংগঠনগুলোর একাধিক নেতার ভাষ্য, পৃথিবীর কোথাও সরকার চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ করে দেয় না। এ ছাড়া দেশে অন্য কোনো পেশায় কারও ফি যখন নির্ধারিত হয়নি তাহলে শুধু চিকিৎসকদের ফি কেন নির্ধারণ করা হবে?

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, বিআরবি হাসপাতাল, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসকের ফি ২ হাজার টাকার বেশি। তবে এসব হাসপাতালে বেশিরভাগেরই ফি ১২০০ টাকা থেকে ১৬০০ টাকা। তবে ১০০০ টাকা থাকলেও তা খুব কম। এ ছাড়া ছোট, মাঝারি মানের ক্লিনিকেও একই ধরনের ফি নিতে দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, এসব হাসপাতালের অধ্যাপকের চেয়ে কোনো কোনো সহকারী কিংবা সহযোগী অধ্যাপকের ফি অনেক বেশি।

সিরাজগঞ্জের সদর থেকে আসা আমেনা খাতুন নামের এক রোগী আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে পায়ের চিকিৎসা নিতে আসেন। তিনি ৫ বছর আগেও এই সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন। আমেনা খাতুন সময়ের আলোকে বলেন, ৫ বছর আগে স্যারের কাছে এসেছিলাম তখন স্যারের (ডাক্তারের) ফি ছিল ৭০০ টাকা। এখন সেই ফি বেড়ে ২০০০ টাকা করা হয়েছে। এমনভাবে ফি বাড়লে তো আমাদের মতো গরিব মানুষরা চিকিৎসা না করেই মারা যাবে।

এদিকে ২০০০ টাকা ফি নেওয়া গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, মানুষের রোগ তো ধনী-গরিব দেখে আসে না। আমি আমার যোগ্যতা অনুযায়ী ফি নিই। বিশে^র অন্য দেশের তুলনায় আমরা অনেক কমই ফি নিচ্ছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেসন্স) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২’-এর ৪ ধারায় সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টার বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই অর্ডিন্যান্সের অপব্যবহার করে বেশ কিছু চিকিৎসক অতিরিক্ত ফি নিচ্ছেন। যদিও ১৯৮২’র ৪-এর এই ধারা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, অসাংবিধানিক, বেআইনি এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না- এ ব্যাপারে ২০১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন। এতে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতিকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে আদালতের আদেশও বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে তাদের। এ ছাড়াও চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা’ তৈরির জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করতে নির্দেশনা ছিল হাইকোর্টের।

এরপর ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ করে দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, চিকিৎসকদের জন্য রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া ফির পরিমাণ নির্ধারণের একটি পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

সেই ফি নির্ধারণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালককে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন, প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলসহ (বিএমডিসি) সব স্টেকহোল্ডারকে কমিটিতে রাখা হয়। এতে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া। পরে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতরে এ সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় শেষে সেই সময় ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া বলছিলেন, কমিটিকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। তারা আগামী দুই সপ্তাহ পরে যে প্রস্তাব দেবে সেটি আবার পর্যালোচনা করা হবে। কিন্তু এর পর আর কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি এবং দেওয়া হয়নি কোনো প্রস্তাব।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া সময়ের আলোকে বলেন, চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণে আমরা একটা মিটিং করেছিলাম। এরপর আর কোনো মিটিং হয়নি। তিনি বলেন, মূলত স্টেকহোল্ডারদের বিরোধিতার কারণে নীতিমালা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

নীতিমালা না থাকার কারণে চিকিৎসকদের ইচ্ছেমতো ফি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে ফরিদ হোসেন মিয়া বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষার নীতিমালার আইন হচ্ছে। আইন হলে কেউ অতিরিক্ত ফি নিতে পারবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, দেশে শিক্ষক, প্রকৌশলী কিংবা আইনজীবীসহ অন্য কোনো পেশার ফি সরকার বা অন্য কেউ নির্ধারণ করে দেয়নি। তাহলে চিকিৎসকদের ফি কেন নির্ধারণ করতে হবে। একজন চিকিৎসক রোগীকে সেবা দিয়ে কত টাকা ফি নেবেন সেটা তার একান্তই নিজস্ব ব্যাপার।

চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের বিরোধিতার কারণে আটকে আছে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস ফি নির্ধারণ নীতিমালা- এমন অভিযোগের ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া সময়ের আলোকে বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ করা হয়নি। উন্নত দেশ আমেরিকা, ইংল্যান্ডেও ফি নির্ধারিত নেই। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও চিকিৎসকদের কোনো ফি নির্ধারণ করা নেই। তাহলে আমাদের ফি নির্ধারণ নিয়ে এত ইন্টারেস্ট কেন? তিনি বলেন, একজন রোগীর চিকিৎসায় যে টাকা খরচ হয়, সেখানে বাংলাদেশের একজন চিকিৎসকের ফি সেই তুলনায় খুব নগণ্য।


আরও সংবাদ   বিষয়:  ডাক্তারের ফি   ডাক্তারের ভিজিট  




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]