ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২ ৩ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

ইনসান পাগলার গল্প
সারোয়ার কবীর
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২১, ১১:৪৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 210

‘নাম কী তোমার?’

কোনো জবাব নেই। বয়স চল্লিশের ওপর হবে। গায়ে ময়লা একটা শাড়ি, তার ওপর গরমের ভেতর ফুলহাতা উলের কার্ডিগান। কার্তিক মাসের প্রথম দিকে ক্ষেত-খামার থেকে বর্ষার পানি সরে যখন খালে-নদীতে গিয়ে ঠেকছে তখন তার আবির্ভাব। গোয়ালমারী বাজারখোলার মধ্যিখানে চারপাশে ডালপালা মেলে থাকা একটা বটগাছ। সেই গাছের গোড়ায় আশ্রয় নেয় সে। 
দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। হানাদার পাকিস্তানি মিলিটারির ভয়ে অনেক মানুষ শহর ছেড়ে গেরামে এসে থাকছে। অনেকেই চলে গেছে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে। তাদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা যেমন আছে, তেমনি আছে লাখো শরণার্থী। ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াটা মানুষের কাছে যখন স্বাভাবিক। মৃত্যুর আশঙ্কা কমবেশি সবার মনে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারখোলার মধ্যিখানে বটগাছের তলায় মহিলাকে জুড়ে বসতে দেখে কেউ তেমন অবাক হয়নি। তার পোশাকেই বলে দেয়, মাথায় কোনো গোলমাল আছে।

একজন নয়, অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে তার নাম। জবাব পায়নি কেউ। বড় একটা কথা বলত না, বেশিরভাগ সময় চুপচাপ। কোনো প্রশ্ন করলে নিরুত্তর। শুধু নামই নয়, কোথায় তার বাড়ি, কোত্থেকে এলো এই গোয়ালমারী বাজারে- পিতা-মাতার নাম পরিচয়- কিছুই জানা ছিল না কারও। তবে সপ্তাহ কয়েকের মাথায় রটে গেল- তার নাম ইনসান পাগলা। কে কীভাবে নামটা জানতে পারল বা রটিয়ে দিল তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠেনি। লোকে তাকে ইনসান পাগলি বলেই ডাকতে থাকে। তাতে কিছু যায় আসত না তার। কেউ খাবার দিলে খায়। নয়তো চুপচাপ বসে থাকে বটতলায়। কখনও কখনও একদিক-সেদিক হেঁটে আবার আগের জায়গায় গিয়ে বসে। চুপচাপ থাকতে অভ্যস্ত এ পাগলি কারও ক্ষতি করে না।

দেখতে দেখতে গাঁ-গেরামে শীত পড়তে শুরু করে। ইনসান পাগলা নিজের খেয়াল-খুশিমতো দিন কাটায়। কেউ তাকে ঘাঁটায় না। আর ঘাঁটানোর মতো অবস্থাও তখন ছিল না। একসময় গোয়ালমারীতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল এসে হাজির। বাজারের পাশের গেরামে তারা ঘাঁটি গাড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনে হানাদার বাহিনীর সহযোগী কয়েকজন দালাল আর রাজাকার ধরা পড়ে। গণপিটুনির ভয়ে বাকিরা গোয়ালমারী ছেড়ে পালায়। পালিয়ে গিয়ে তারা মিলিটারি ক্যাম্পে খবর দেয়।
সেদিন রোজার শেষে ঈদের চাঁদ আকাশে দেখা দেয়। পরদিন ঈদ। বাড়ি থেকে দূরে কিংবা রণাঙ্গনে থাকলেও মুক্তিযোদ্ধারা বেশিরভাগই মুসলমান। ঈদ পালনের প্রস্তুতি নিতে থাকে। গোয়ালমারীতে যারা ঘাঁটির পাহারায় নিয়োজিত ছিল তারাও ঈদ দেখে একটা গা ঢিলে দেয়। আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের ধারণার বাইরে ছিল, ঈদের দিনেও হানাদার বাহিনী হামলা চালাতে পারে। 
ভোররাতে পাকিস্তানি মিলিটারি তাদের দোসরদের নিয়ে গোয়ালমারীতে হানা দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা গভীর ঘুমে। কিন্তু বাজারের বটতলার নিচে ইনসান পাগলা তখন সজাগ। পাগলা ঠিকই আঁচ করতে পারে, কী ঘটতে যাচ্ছে। অমনিই বটতলা ছেড়ে এগিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটির দিকে। চিৎকার করতে থাকে- ‘আইয়ে রে, আইয়ে’।
তার চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে পাগলাকে চিল্লাচিল্লি করতে নিষেধ করে। 
গালমন্দও বাদ যায় না। কিন্তু ইনসান পাগলা কারও কথা গায়ে না মেখে সমানে চিৎকার করে যায়- আইয়ে রে, আইয়ে...
এই চিৎকারের অর্থ বোঝা গেল কিছুক্ষণ পর হানাদার বাহিনী যখন গুলি চালিয়ে গোয়ালমারী বাজারে প্রবেশ করে। মুক্তিযোদ্ধারা সতর্ক হয়ে যায়। শুরু হয় দুপক্ষের গোলাগুলি। অন্যদিকে আশপাশে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর পৌঁছে যায়, গোয়ালমারী বাজার আক্রমণ করেছে মিলিটারি। 

ওই সময় দেশজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে হানাদার বাহিনীর কোণঠাসা হয়ে পড়ার মতো অবস্থা। ভোরের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়। বিকাল পর্যন্ত লড়াই চলে। একপর্যায়ে দিশেহারা হয়ে হানাদার বাহিনী পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। গোয়ালমারী যুদ্ধে আট মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং ৪২ জন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। 

ইনসান পাগলার উপস্থিত বুদ্ধির কারণে গভীর ঘুমে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পায়। যুদ্ধের পর দেখা গেল, ইনসান পাগলা ইহলোকে আর নেই। গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মরদেহ পড়ে আছে বটতলায়।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]