ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ১০ আগস্ট ২০২২ ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯
ই-পেপার  বুধবার ১০ আগস্ট ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম: ইতিহাসের যাত্রাপথের পথিক
ড. সরকার আবদুল মান্নান
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২১, ১১:১৯ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 223

আশির দশকের গোড়া থেকে তাকে আমি চিনি। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার কলাকান্দা গ্রামে। আমার বাড়িও তার গ্রামের কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে। তিনি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। বললাম বটে তাকে আমি চিনি, কিন্তু ২০১৯ সালের আগে কখনই তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, কথা হয়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের জন্য সরকার যে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি তৈরি করে তিনি তার সভাপতি ছিলেন। এই কমিটির কার্যালয় সেগুনবাগিচায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ভবনের পঞ্চম তলায়। 

আর এখানেই বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ড. রফিকুল ইসলাম ও প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর দফতর। সৌভাগ্যক্রমে তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ ঘটে আমার। আর সেই সুবাদেই রফিক স্যারের সঙ্গে আমার দেখা হয়, কথা হয় এবং তার অসাধারণ স্মৃতিচারণ শোনার সুযোগ হয়। ক্রমেই তিনি আমার প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু এ সময়েও ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। ২০২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তার সঙ্গে প্রতি সপ্তাহেই দুয়েকবার দেখা হতো। বিশেষ করে প্রধান সমন্বয়কের দফতরে তিনি বিচিত্র বিষয় নিয়ে স্মৃতিচারণ করতেন। অসাধারণ স্মৃতিধর এই মানুষটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর দেশ বিভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাকার বিষয় নিয়ে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ তুলে ধরার সময় মনে হতো তিনি জ্বলে উঠছেন। আর সেসব অভিজ্ঞতা এতটা জীবন্তভাবে তিনি উপস্থাপন করতেন এবং এতসব খুঁটিনাটি তিনি মনে করে বলতে পারতেন যে আমরা বিস্ময়াবিভূত হতাম। 

মনে আছে, তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতার পর তার পরিচালিত একটি নাটক অভিনীত হয়েছিল কলকাতায় এবং সেই নাটকে অভিনয় করেছিলেন শেখ কামাল ও অন্যরা। ফেরার পথে শেখ কামাল তার জন্য একটি হারমোনিয়ায় নিয়ে এসেছিলেন এবং কাঁধে করে সেই হারমোনিয়াম তার বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই স্মৃতি তিনি কখনই ভোলেননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়েও তার কিছু মধুর স্মৃতি তর্পণ করেছেন বিভিন্ন আলোচনায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, স্যারের সান্নিধ্য লাভ করার সুযোগ বেশিদিন হয়নি। বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি শুরু হলে তিনি আর অফিসে আসেননি। জরুরি দুয়েকটি মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া অধিকাংশ সময় তিনি মিটিংগুলোতে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করতেন। ফলে তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ আর হয়নি। ফোনে দুয়েকবার কথা হয়েছে। তাকে কখনই অসুস্থ মনে হয়নি। ৩০ নভেম্বর ২০২১ তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের স্বাধীনতার গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী এই মহান শিক্ষকের সঙ্গে আর কোনোদিন কথা বলার সুযোগ হবে না।

কিন্তু প্রথমেই যে বললাম, আশির দশকের শুরু থেকেই তাকে আমি চিনি, তার কারণ অধ্যয়নকেন্দ্রিক। তাকে আমি ভাষাতাত্ত্বিক মনে করতাম। কারণ জেনেছিলাম যে, তিনি ভাষাতত্ত্বের একজন গবেষক। আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার থেকে ভাষাতত্ত্ব নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ গবেষণা করেছেন। 

আর তারই প্রতিফলন ঘটেছে তার ভাষাতত্ত্ব শীর্ষক গ্রন্থে। এই গ্রন্থটি তখন বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কাছে ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। মূলত এই গ্রন্থটি পাঠ করে আমাদের ভাষাতত্ত্বের বৈতরণী পার করতে হতো। কিন্তু পরে জেনেছি তিনি ভাষাতত্ত্বের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক নজরুলের জীবন, নজরুলসাহিত্য ও সঙ্গীত গবেষণায়। যতটুকু জেনেছি, গত শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তার শিক্ষক ধ্বনিবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের প্রেরণায় প্রথম কবি নজরুলকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৫৭ সাল থেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি নজরুল গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন এবং প্রায় ছয় দশক নিরবচ্ছিন্নভাবে নজরুলের সৃষ্টির মহিমাকে উন্মোচন করতে থাকেন। বাঙালি জাতির শক্তির মূলে নিহিত আছে যে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবপ্রেম- নজরুলের সৃষ্টির আলোকে তার রূপ-রস-আনন্দ ও সৌন্দর্য নিরূপণ করে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম নজরুল অধ্যয়নে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। আমরা নিশ্চয়ই জানি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রভাবনার মূলেও ছিল এই জীবনাদর্শ, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবপ্রেম। ফলে অনিবার্যভাবেই অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনাদর্শের এই অধ্যায়কে নিষ্ঠার সঙ্গে লালন করতেন। আর গবেষণার এই পথ ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম নজরুল অধ্যাপক এবং নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের প্রথম পরিচালক হয়েছিলেন। 

ইতিহাসের যে যাত্রাপথ থেকে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয় সেই যাত্রাপথের একজন পথিক ছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ১৯৪৭ সালে যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয় তার বিভিন্ন মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেসের ছবি তুলেছেন তরুণ শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম। সেই সময়ের যেসব ছবি এখন বহুল প্রচলিত তার অধিকাংশই তার ক্যামেরায় তোলা। তার এই দাবি অমূলক নয়। ১৯৫২ সালে তিনি প্রত্যক্ষভাবে মিছিল-মিটিংয়ে যোগদান করেন। ৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল সংলগ্ন রাস্তায় যে মিছিলে গুলিবর্ষণ হয় এবং বহু তরুণ আত্মহুতি দেয় সেই মিছিলে তিনিও ছিলেন। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য মনে করে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়তেন। ফলে অনিবার্যভাবেই তার লেখালেখি ও বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে তার বক্তব্যের মধ্যে এই বিষয়গুলো গভীর মমত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। 

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জুলাই কিংবা আগস্ট মাসের প্রথম দিকে তাকেসহ আরও চারজন শিক্ষককে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে রেখে তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়। সেই সময় তার সহকর্মী প্রফেসর নুরুল ইসলাম, প্রফেসর আনিসুর রহমান, প্রফেসর রেহমান সোবহান ও প্রফেসর মোশাররফ হোসেন ছিলেন ওয়াশিংটনে। তারা অনেক সিনেটরের স্বাক্ষরসংবলিত একটি প্রতিবাদপত্রসহ সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির শরণাপন্ন হন এবং আটককৃত শিক্ষকদের হত্যা করার আশঙ্কার কথা তাকে জানান। মি. কেনেডি ভুট্টোকে টেলিফোনে বিষয়টি অবহিত করেন এবং তারপরই হানাদার বাহিনী তাদেরকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে কেন্দ্রীয় জেলখানায় স্থানান্তর করে। এভাবে তারা প্রাণে বেঁচে যান।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এক জীবন অতিবাহিত করেছেন বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ভেতর দিয়ে। তার সেই অধ্যয়নের ও লেখালেখির মূলে ছিল বাংলাদেশ, এ দেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার প্রেরণার জায়গাটি ছিল বেশ স্পর্শকাতর। ফলে অনিবার্যভাবেই তার লেখালেখির কেন্দ্রে ছিল বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ইতিহাস। এ পর্যন্ত তিনি ত্রিশটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো- নজরুল নির্দেশিকা, ভাষাতত্ত্ব, নজরুল জীবনী, বীরের এই রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রুধারা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ঢাকার কথা, ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার, কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও কবিতা, কাজী নজরুল ইসলামের গীতিসাহিত্য, বাংলা ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ, ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধাবলী, বাংলা ব্যাকরণ সমীক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর (২০০৩), হাজার বছরের বাংলা সাহিত্য ইত্যাদি।

জীবদ্দশায় অসামান্য অবদানের জন্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এ ছাড়া এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকেও ভূষিত হয়েছেন। ২০১৮ সালে সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করে।

যৌবনের প্রারম্ভে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক যে জীবনাদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন কোনো দিন সেই জীবনাদর্শের ব্যত্যয় ঘটেনি। বাঙালি জীবনের প্রতিটি আদর্শ ও মূল্যবোধকে তিনি পরম যত্নে ধারণ করেছিলেন এবং ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন তিনি। এই মানুষটির মহাপ্রয়াণে খুব ক্ষতি হলো আমাদের। যারা গুণিজন, ত্রিকালদর্শী, যারা বিবেক, জাতির দুঃসময়ে যারা পথপ্রদর্শক করোনা মহামারি এই সঙ্কটাপন্ন সময়ে তাদের অনেককেই হারাতে হলো আমাদের, যেন একে একে নিভিছে দেউটি।


আরও সংবাদ   বিষয়:  অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম  




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]