ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ১৯ আগস্ট ২০২২ ৪ ভাদ্র ১৪২৯
ই-পেপার শুক্রবার ১৯ আগস্ট ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

বিজয় নিশান উড়ছে ওই
অরূপ তালুকদার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২১, ৯:৩৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 208

শুরু হয়েছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। একাত্তরে দীর্ঘ ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সীমাহীন দুঃশাসন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে অনবরত যুদ্ধ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জন করেছি আমরা আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। 

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর অত্যাচারী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত এবং পরাজিত করে আমাদের বিজয় অর্জিত হয় লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে। সেই থেকে হাজারো স্মৃতি বিজড়িত ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। 

স্মরণ করা যেতে পারে, একাত্তরের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে উদ্দীপ্ত হয়ে দেশের কোটি কোটি প্রতিবাদী জনতা সেদিন 

দেশমাতৃকাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করার জন্য নিজেদের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে অকুতোভয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। মুক্তির প্রবল আকাক্সক্ষায় সেদিন নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ধর্ম বর্ণ দল মত নির্বিশেষে প্রতিবাদমুখর সেই জনতা যোগ দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। কোনো পিছুটান সেদিন তাদের ছিল না, চোখের সম্মুখে ছিল শুধু সার্বিক মুক্তির আকাক্সক্ষা ও স্বাধীনতার স্বপ্ন। 

তারপর দীর্ঘ ৯ মাস কীভাবে কেটেছে, কত দুঃখ কষ্ট আর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে কীভাবে এদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ একদিন স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছে তা আজ স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে বাংলার ইতিহাসে। 

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের হাজারো অপমান আর নিষ্ঠুর নির্যাতন এবং গুলির নিশানা থেকে জীবন নিয়ে যারা কোনো রকমে বেঁচে গেছেন তারা দেখেছেন কীভাবে এদেশের কোটি কোটি মানুষ বেঁচে থাকার অন্তহীন প্রচেষ্টা আর মুক্তির অদম্য আকাক্সক্ষা নিয়ে বিজয়ের মাসে আবার নতুন করে বেঁচে থাকার জীবন সংগ্রামে শামিল হয়েছেন।
বলা যায়, সহায় সম্বল আশ্রয়হীন কোটি কোটি মানুষের কাছে একাত্তরের বিজয়ের মাসের সেই দিনগুলো ছিল নতুন করে নিজেদেরকে মুক্ত স্বাধীন এক দেশের নাগরিক হিসেবে চিনে নেওয়ার সময়। 

একাত্তরে চলমান মুক্তিযুদ্ধকালে শুরু থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের কর্মীরা বিভিন্ন সময় নানা ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। ভালো-মন্দ, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ বিজড়িত কত যে ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটে যেত, তার কোনো হিসাব নেই। সব আজ স্মৃতিময় ইতিহাস।

কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের দোতলা বিল্ডিংয়ে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে তখন নানা ধরনের অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে যার মধ্যে ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে প্রচারিত কথিকা, গান, কবিতা, সাক্ষাৎকার ইত্যাদিসহ বিভিন্ন রকমের প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান। বিশেষ বিশেষ দিবস উদযাপন উপলক্ষে প্রচারিত হতো বিশেষ অনুষ্ঠানসমূহ। এই বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত জল্লাদের দরবার-এর মতো নাটক, গান এবং চরমপত্র-এর মতো বেশ কিছু অনুষ্ঠানের কথা সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরত। 

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা যেমন বেড়ে গিয়েছিল তেমনি পকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যুদ্ধে হেরে গিয়ে পিছু হটে যাওয়ার, খবরা-খবরও স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণভাবে জোরেশোরে প্রচার করা হতো হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য। এ কারণে রণাঙ্গনের খবরা-খবরসহ নানা রকম তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের জন্য বার্তা বিভাগের কর্মীরা তখন খুবই তৎপর থাকতেন। 

ডিসেম্বর মাস শুরু হতে না হতেই আমরা যারা স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলাম, তারা বিভিন্ন দিকের খবরা-খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বুঝতে পারছিলাম মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় আর বেশি দূরে নেই। 

ততদিনে আমাদের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সমন্বয়ে গঠিত হয়ে গিয়েছিল যৌথবাহিনী, যাদের দাপটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দিনের পর দিন দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ক্রমাগত পিছু হটছিল। যুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে হেলিকপ্টার থেকে ‘হাতিয়ার ডাল দো’ লেখা লিফলেট ফেলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান জানানো হয়। 

অনেকেই জানেন না যে, ইংরেজি ভাষায় সারেন্ডারের যে আহ্বান সে সময় মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীকে জানানো হয়েছিল তার বাংলা এবং উর্দু অনুবাদ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের বার্তা বিভাগ থেকেই করে দেওয়া হয়েছিল। 
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। 

ওই দিন বিকালে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় বিশেষ সংবাদ বুলেটিন। তারপরে প্রচারিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত সেই বিখ্যাত গানটি। বিশেষ সংবাদ বুলেটিন এবং ওই গানটি প্রচারের নেপথ্যে সেদিন ছিলেন বার্তা বিভাগের প্রধান প্রখ্যাত সংস্কৃতজন, সাংবাদিক ও শব্দসৈনিক কামাল লোহানী। 

সেদিনের সেই বিশেষ সময়ের কথা তিনি যেমন বলেছেন, ‘উপস্থিত হলো মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৬ ডিসেম্বর। আজ বিকালে রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করবে। আমরা স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম। বিশেষ সংবাদ বুলেটিন প্রচারের ঠিক পরপরই রচিত ও সুরারোপিত হলো বিজয়ের গান। শহিদুল ইসলামের কথা আর সুজেয় শ্যামের সুরে কণ্ঠশিল্পী অজিত রায়। সহযোদ্ধাদের কণ্ঠে গীত হলো- বিজয় নিশান উড়ছে, উড়ছে বাংলার ঘরে ঘরে...।’

দুপুরেই আমরা এক নম্বর স্টুডিওতে বসে পড়লাম এই বহুদিনের আকাক্সিক্ষত, রক্তোৎপল দিনক্ষণের বিবরণ সংবাদ আকারে বিজয়ী দেশবাসী এবং সমর্থক সারা বিশ্বের বন্ধু ও ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণকে জানাতে। বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে আমাকেই বিশেষ সংবাদ বুলেটিন রচনা করতে হবে। তাই সহযোদ্ধা বেলাল মোহাম্মদ, আশফাকুর রহমান খান, প্রকৌশলী আবদুশ শাকের, আমিনুর রাশেদ ও শরফুজ্জামান সবাই পরামর্শ দিলেন কীভাবে লিখতে হবে। বললেন, ‘এটা তো আপনি ভালো বুঝবেন। আপনিই লিখুন। এতে দেশপ্রেমের আবেগ, বিজয়ের আনন্দ এবং বিপুল রক্তক্ষয়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর থাকতে হবে। হতে হবে ঘৃণার উদগিরণ আর ব্যক্ত হবে দৃঢ় প্রত্যয়।’

সেদিন বাংলার আপামর জনসাধারণের দীর্ঘ তেইশ বছরের সংগ্রাম এবং ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের রচিত হযেছিল এক অনন্য সাধারণ মহিমা। লেখা, সুর সংযোজন ও পরিবেশনার কারণে ওই গানটিও পরে ইতিহাস হয়ে গেছে। 

বিজয়ের সংবাদ বুলেটিন স্বাধীন বাংলা বেতারে ধ্বনিত হওয়ার পরপরই বেজে উঠেছিল ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’। এর সৃষ্টিও যেন আরেক ইতিহাস। মানুষের অসাধ্য যে কিছুই নেই, এটা বোধহয় তারই আরেক নমুনা। 

গীতিকার, সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম দুই লাইন করে লিখছেন, তাৎক্ষণিক সুরারোপ করছেন সুরকার সুজেয় শ্যাম। কী অসাধারণ দেশপ্রেম, মাতৃভক্তি ও বিজয়ের আনন্দে যেন আমরা সবাই রণাঙ্গনে আর অবরুদ্ধ বাংলায় সব মানুষ এক কণ্ঠে যেন গাইছি, ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’। সম্মিলিত কণ্ঠ সব গায়কের, নেতৃত্বে সংগ্রামী কণ্ঠশিল্পী অজিত রায়।

এই বিখ্যাত গানটির গীতিকার ভোলা জেলার ছেলে আমাদের বন্ধু শহিদুল ইসলাম অনেক আগেই এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন। করোনা মহামারির সময় চলে গেলেন আমাদের সবার প্রিয় মানুষ স্বাধীন বাংলা বেতারকর্মী পরিষদের সভাপতি সর্বজন শ্রদ্ধেয় সংস্কৃতিজন কামাল লোহানী। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। এই দুজন মানুষকে আমি এ জীবনে কোনোদিন ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। এখনও বিশেষ করে, ডিসেম্বর মাস এলেই এই দুজন প্রিয় মানুষসহ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সবার কথা বারবার মনে পড়ে। 

শব্দসৈনিক ও কথাসাহিত্যিক




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]