ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২২ জানুয়ারি ২০২২ ৮ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার শনিবার ২২ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

সিনেমার টিকেট ব্ল্যাকার থেকে মেয়র
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ২১ নভেম্বর, ২০২১, ১:০৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 728

আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন মো. জাহাঙ্গীর আলম। এর আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দলের সভাপতি গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করেন তাকে। দলীয় পদ এবং সরকারে থেকেও গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি। গোপনে ধারণ করা তার এই মন্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওতে জাহাঙ্গীরের আপত্তিকর বক্তব্য শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। এ ঘটনায় গাজীপুরের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ নিয়ে গাজীপুরে মেয়র-সমর্থকদের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের এক চিঠিতে জাহাঙ্গীর আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়ে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে এর জবাব দিতে বলা হয়। তিনি জবাবও দেন। জবাবে ভিডিওটি ‘সুপার এডিট’ করা বলে বারবার দাবি করেন জাহাঙ্গীর আলম। তারপরও তার শেষ রক্ষা হয়নি। শুক্রবার দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে তাকে।

এরপরই তার উত্থান, অপকর্ম ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলমের বাবা কৃষক মিজানুর রহমান নোয়াখালীর সোনাইমুরি থেকে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামে এসে বসতি গড়েন। পরে জয়দেবপুরের কানাইয়া গ্রামে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে কৃষিকাজের পাশাপাশি বাজারে গেঞ্জি বিক্রি করতেন। ওই গ্রামেই ১৯৭৯ সালে জন্ম জাহাঙ্গীর আলমের। দরিদ্র পরিবার থাকায়, মামা মোহাম্মদ আলমের সংসারে বেড়ে ওঠেন জাহাঙ্গীর। মামার সংসারে থেকেই গাজীপুরের চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। স্কুলজীবন থেকে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্থানীয় উল্কা সিনেমা হলে ব্ল্যাকে টিকেট বিক্রি করে পকেট খরচ চালাতেন। এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন জেলার ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে। জাহাঙ্গীরের মামা মোহাম্মদ আলম সে সময়ের বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন। এ কারণে তার সঙ্গে জাহাঙ্গীরেরও সখ্য গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলেও ক্ষমতাধর লোকদের দালালি, তদবির এবং জেমএবি জঙ্গিদের কাছে বিস্ফোরক দ্রব্য সাপ্লাই দিয়ে কোটি টাকার মালিক হয়ে যান অল্প সময়ে।

জাহাঙ্গীর একসময় এলাকায় ‘জেএমবি জাহাঙ্গীর’ নামেও পরিচিতি ছিলেন। ২০০৬ সালের দিকে বিস্ফোরক সাপ্লাইয়ের অভিযোগে একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন পুলিশের হাতে। ১০ লাখ টাকা রফাদফায় সে যাত্রায় পার পেয়ে যান।

মূলত জাহাঙ্গীরের রাজনৈতিক উত্থান ১৯৯৯ সালে। ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের ভিপি পদে ওই বছর জাহাঙ্গীর ছাত্রলীগের প্যানেলে নির্বাচন করেন। কলেজটি ছাত্রলীগের ঘাঁটি হলেও ব্যক্তিগত খাসলতের কারণে তিনি পরাজিত হন। ওই কলেজের ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে তিনি পরিচিতি পেয়ে যান। পরে এ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান।

ছাত্ররাজনীতি শেষে ২০০৯ সালে তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে গাজীপুরে সর্বমহলে পরিচিতি লাভ করেন। শিল্পনগরী গাজীপুরে বিভিন্ন গার্মেটন্সে শুরু করেন ঝুট ব্যবসা। ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আধিপত্য বিস্তারের জন্য তৈরি করেন নিজস্ব বাহিনী। অল্প সময়ের ব্যবধানে জাহাঙ্গীর শত শত কোটি টাকা এবং বিঘার পর বিঘা জমির মালিক হন।

স্থানীয় অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জাহাঙ্গীরের টাকার পরিমাণ তিনি নিজেও জানেন না। হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বহু আগেই। তিনি এলাকায় পরোপকারী হিসেবেও বেশ পরিচিত। তার কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ ফেরত যায়নি। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের এমন কোনো মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় নেই যেখানে জাহাঙ্গীরের আর্থিক সহায়তা দেননি। এ ছাড়া জাতীয় শোক দিবসে মহানগরের ৫৭টি ওয়ার্ডে একটি করে গরু এবং নগদ অর্থ দিতেন কাঙালিভোজের জন্য। তবে এটাকে একটা কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকে। সামাজিক অনেক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করে দ্রুতই জেলার বর্ষীয়ান সব আওয়ামী লীগ নেতাকে পেছনে ফেলে তিনি চলে আসেন সামনের কাতারে। তবে অল্প সময়ে তার এ উত্থান এবং স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের অবমূল্যায়নের রাজনীতিতে বিভক্তির সৃষ্টি হয়। বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের লোকজন নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন দাতব্য সংস্থা ‘জাহাঙ্গীর আলম ফাউন্ডেশন’। আওয়ামী লীগের ব্যানারে সবকিছু করলেও দলীয় অনেক নেতাকর্মী ছিলেন সেখানে উপেক্ষিত। মহানগরের ৫৭টি ওয়ার্ডেই এ সংস্থার কমিটি রয়েছে। অনেকে বলছেন, এই ফাউন্ডেশনের আড়ালে জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগকে দুর্বল করে তিনি তার নিজের সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল্লাহ আল মামুন মণ্ডলের অভিযোগ, জাহাঙ্গীর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের ইচ্ছামতো চালাতে থাকেন সিটি করপোরেশন। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সভাতেই প্যানেল মেয়র নির্বাচিত করার বিধি লঙ্ঘন করেন। তার মেয়াদের সাড়ে তিন বছর চলে গেলেও এখন পর্যন্ত প্যানেল মেয়র নির্বাচিত করেননি। জাহাঙ্গীর চেয়েছিলেন সবাই তার হুকুমের দাস হয়ে থাকবে। এ ছাড়া মেয়র হওয়ার পরে তিনি নিজস্ব উদ্যোগে ৩০০ জনকে ট্রাফিক সহকারী নিয়োগ দেন। সড়ক-মহাসড়কগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তথাকথিত ট্রাফিক সহকারীদের হাতে সিটির যানজট নিরসনের দায়িত্ব তুলে দিয়ে ট্রাফিক পুলিশের পেশাদারিত্ব খর্ব করেন।
 
এ ছাড়া মহানগরীর ৮ হাজার বিঘা জমিতে ৮০০ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ করেছেন। এতে প্রায় ৩১ হাজার ঘরবাড়ি, মসজিদ-মন্দির, কবরস্থান সরানো হয়েছে। রাস্তা নির্মাণের জন্য ভ‚মি অধিগ্রহণ না করেই ইচ্ছামতো এসব করেন। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করলে মর্জিমাফিক নামমাত্র টাকা দিয়েছেন। অনেকে আবার সে টাকাও পায়নি। তার কারণে বহু মানুষ নিজের জমি হারিয়ে কেঁদেছেন। তাদের অভিশাপ গ্রাস করেছে তাকে।

এদিকে জাহাঙ্গীরের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়ে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপের জন্য শোকজ করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ৪৭ ধারা অনুযায়ী কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তার ব্যাখা চাওয়া হয়েছিল। তিনি জবাব দিয়েছেন। তবে সে জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারেনি দল। তাই তাকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তে গাজীপুরের আওয়ামী পরিবার শুধু নয় সারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানুষের যে রক্তক্ষরণ হয়েছিল তা মোচন হয়েছে।

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আফজাল হোসেন সরকার রিপন বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটুক্তির বিচারের দাবিতে গাজীপুরবাসী অপেক্ষায় ছিল তার অবসান হয়েছে। এতে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগে কোনো প্রকার প্রভাব পড়বে না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি মহাসাগর। এ সাগর থেকে অল্প এক বিন্দু চলে গেলে আওয়ামী লীগের কিছুই হবে না। মহানগর আওয়ামী লীগ এখন সঠিকভাবে পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, জাহাঙ্গীর চান্দনা চৌরাস্তায় তার মামার দোকানে চাকরি করত। তার ছাত্রত্ব, পেশা সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ। সে সবসময় বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ট হিসেবে কাজ করত। তার উত্থান আলাদিনের চেরাগকেও হার মানায়। তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ছিল জাল। এ বিষয়ে তখন ভাওয়াল কলেজের প্রিন্সিপাল ইউসুফ আলী ঢাকা বোর্ডে একটি লিখিত অভিযোগও করেছিলেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]