ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

প্রযুক্তির হাত ধরে স্বপ্ন শিখরে তারা
শাকিল আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২১, ১১:২৫ এএম আপডেট: ২০.১১.২০২১ ১১:৩৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 232

চাকরির জন্য ঘুরেছেন দুয়ারে দুয়ারে। বেকারত্বের কারণে প্রিয়তমাকেও হারাতে বসেছিলেন। মাত্র ২৫০ টাকা ফি-তে করেছেন টিউশনি। ভাগ্য বদলাতে একের পর এক চাকরি বদল করেও সাফল্য আসেনি। তাই বলে কি সবকিছু থেমে যাবে? মোটেও না, জীবনে বড় হওয়ার একাগ্রতা আছে যার, তাকে থামায় কে? তাই তো উদ্যম ও সাহসে ভর করে চেষ্টা আর পরিশ্রমে নিজেই সৃষ্টি করেছেন শত শত তরুণের কর্মসংস্থান। হয়েছেন শত তরুণের অনুপ্রেরণার উৎস। আর এ সবকিছুই তার জন্য সম্ভব হয়েছে দেশের প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতির ফলে। এ সাফল্যগাথা আইসিটি খাতের তরুণ উদ্যোক্তা ও ফ্লিট বাংলাদেশের কর্ণধার মো. খায়রুল আলমের।

সময়টা ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ক্ষমতায় এসে প্রথমেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের উদ্যোগ নেয় বর্তমান সরকার। লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয় ২০২১ পর্যন্ত, অর্থাৎ ভিশন-২০২১। ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বাকি আর মাত্র ১ মাস। ২০০৮ থেকে ২০২১, এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে ১৩টি বছর। প্রশ্ন জাগতেই পারে ডিজিটাল বংলাদেশের স্বপ্ন কতদূর? এই ১৩ বছরে কতটা এগিয়েছে দেশের প্রযুক্তি খাত?

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ট্যুর’-এর সঙ্গে সরেজমিন জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সফরে গিয়ে সরাসরি আইসিটি যোদ্ধাদের কাছ থেকেই জানা গেছে সেই এগিয়ে যাওয়ার কাহিনি। নিজেদের দিন বদলের গল্প শুনিয়েছেন তারা। 

এ সফরেই কথা হয় খায়রুল আলমের সঙ্গে। সময়ের অলোকে তিনি বলেন, সময়টা ২০০৫ সাল। বিটিভিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর একটা প্রোগ্রামের মাধ্যমে খায়রুল জানতে পারেন অনলাইনে কাজ করে টাকা আয় করা যায়। শুনে কৌতূহল জাগে, কম্পিউটার থেকে আবার কীভাবে আয় করে?। এরপর ২০০৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ঢাকার ক্যাম্পাসে। ভর্তির তিন মাসের মাথায় বাবাকে হারিয়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যায়। কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তখন মনে পড়ে ২০০৫ সালে দেখা সেই অনুষ্ঠানের কথা। মাথায় চেপে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়টি। 

খায়রুল বলেন, শুরুর যাত্রাটা খুব সহজ ছিল না। আমার বাবা ডাক বিভাগের একজন কর্মচারী ছিলেন। তখন সরকারি চাকরিজীবীদের মাস শেষে টানাটানি চলত। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। সবসময়ই ভাবতাম পড়ালেখার পাশাপাশি কিছু করে পরিবারকে সহযোগিতা করা যায় কিনা। কিন্তু রাজশাহীতে টিউশনি ছাড়া ছাত্রাবস্থায় আর কোনো কাজের সুযোগ ছিল না। টিউশন ফি-ও ছিল খুব কম, মাত্র ২৫০ টাকা পেতাম মাসে। এরপর ২০০৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে চট্টগ্রাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। তিন মাসের ভেতরে বাবা স্ট্রোক করে মারা যান। এরপর পড়ালেখা চালানো কষ্টকর হয়ে যায়। এদিকে বেকারত্বের কারণে নিজের পছন্দের মানুষকেও হারাতে বসেছিলাম, যদিও পরে তাকেই বিয়ে করেছি। একপর্যায়ে অনলাইনে কাজ করে আয় করার বিষয়টা মাথায় ঘুরতে থাকে। নিজের কোনো কম্পিউটার না থাকায় ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ভার্সিটির ল্যাবে বসে অনলাইনে আয় করার চেষ্টা করি। ২০০৮ সালে ‘ফ্রিল্যান্সার ডটকম’ থেকে ২০০ ডলারের একটা কাজ পেয়ে যাই। কিন্তু কাজ করে পাঠিয়ে দেওয়ার পর ক্লায়েন্ট আমাকে ব্লক করে দেয়। এখানেই প্রথম ধাক্কা খাই। তারপর থেমে যাইনি। তবে ফ্রিল্যান্সিং কাজের বেলায় যিনি কাজ দিচ্ছেন, অর্থাৎ ক্লায়েন্টের রেটিং বা সুনামের বিষয়টি যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, অনলাইনে কাজ করে প্রথম উপার্জন করি ১৬ হাজার ৫৩০ টাকা। সেই টাকায় নিজের পিসি আপগ্রেড করি। এরপর থেকে কোনো মাসে ১০ হাজার, কোনো মাসে ২০ হাজার, আবার কোনো মাসে ৫০ হাজার টাকাও আসতে শুরু করে। এই পথচলা আর থেমে থাকেনি। একপর্যায়ে গড়ে তুলি ফ্লিট বাংলাদেশ নামের প্রতিষ্ঠান।
তেরো বছর ফ্রিল্যান্সিং করলেও ফ্লিট বাংলাদেশের বয়স সাড়ে তিন বছর। খায়রুলের ফ্লিট বাংলাদেশ এখন শত শত তরুণের কাজ জোগাচ্ছে, ওয়ালমার্ট এবং অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানের স্টোর ম্যানেজমেন্টের কাজ করছেন রাজশাহীতে বসে।

ফ্লিট বাংলাদেশের কর্ণধার বলেন, এখন রাজশাহীতে আমার আটটা অফিস। আমার ছেলেরা ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা পরিশ্রম করে। এমন ছেলেও আছে যে টানা দুদিনও কাজ করেছে, ঘুমায়নি। এখানে আসা ছেলেমেয়েদর ৯৫ শতাংশের ভাগ্য বদলে গেছে। রাজশাহীতে বসেই তারা ৬ থেকে ১২ লাখ টাকা কমিশন পায়। এটা অবিশ^াস্য হলেও ফ্লিটের কারণে সম্ভব হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজশাহীতে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার ফ্রিল্যান্সার সরাসরি কাজ করছে। এখান থেকে অনেকে বের হয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠান খুলেছে। পার্টটাইম ও ফুলটাইম মিলিয়ে ফ্লিট বাংলাদেশে প্রায় ৫৫৩ জন তরুণ কাজ করছে। 

কেবল আউটসোর্সিং বা সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান নয়, খায়রুল এখন ট্রাভেল এজেন্সি ও ল্যান্ড ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানেও নজর দিয়েছেন। ফ্লিট সিটি গড়ার জন্য রাজশাহীতে ৩০ বিঘা জমি কিনেছেন।

আইসিটি উদ্যোক্তা খায়রুল বলেন, ‘আমি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। আমি জানি, একজন মধ্যবিত্ত তরুণের সাধ আবেগমাখা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই কয়েক বছর আগে কর্মীদের মা-বাবার জন্য হজ প্যাকেজ ও আবাসন সমস্যা সমাধানে হাত দিই। ব্যক্তি পর্যায়ে আবাসন বা প্রতিষ্ঠানটির আওতা বাড়াতে গেলে ওই জমি কাজে লাগবে।’ তরুণদের এই ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ করে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার সজীব ওয়াজেদ জয়কে ধন্যবাদ জানান খায়রুল।

শুধু খায়রুল আলমই নন, প্রযুক্তির কল্যাণে তার মতো অনেকেরই ভাগ্য বদলেছে। তাদেরই একজন যশোরের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এসএম আরিফুজ্জামান। যশোর সদরের আরবপুর ইউনিয়নের ডিজিটাল সেন্টারে সেবা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার যাত্রা শুরু, এ সেন্টারে ৮০টি সেবা দিয়েছেন তিনি। পরে নিজেই একটি সেবা সেন্টার খোলেন। কিছুদিন পরই দুটি সাব-সেন্টার খোলেন। সেন্টার, সাব-সেন্টারগুলোর পাশাপাশি এখন তার রয়েছে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এখান থেকে প্রতিবছর দুই ব্যাচে প্রায় একশ জন ডিপ্লোমা করছেন।

রাজশাহী শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হুজুরীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ। এই ইউনিয়নের ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা জিয়াউল হক। টানাটানির সংসারে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশিদূর এগোতে পারেননি তিনি। এসএসসি শেষে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। তিন বছর ভালোই চলে। হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। দুই বছর পর কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। লোকজন তাকে শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাবতে থাকে। তবে তিনি মানুষের এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণিত করেন। জিয়াউল হক বলেন, ‘আমি নিজেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাবতে চাই না। আমিই ছিলাম পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। শরীরের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ঘরে বসে থাকিনি।’ এর মধ্যে দেশে চালু হয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের কার্যক্রম। নিজ ইউনিয়ন হুজুরীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন জিয়াউল। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ডিজিটাল সেন্টারই বদলে দিয়েছে তার জীবন। 

জিয়াউল হক বলেন, ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশব্যাপী ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। তখন আমাদের ইউনিয়নেও এ কার্যক্রম চালু হয়। ওই সময়েই হুজুরীপাড়া ইউপি তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তা হিসেবে স্বপ্নের পথে পদচারণা শুরু হয়। প্রথম মাসে আমার আয় হয় মাত্র ১ হাজার ৬৪৬ টাকা। প্রথমে দুটি ডেস্কটপ, একটি ল্যাপটপ এবং ৫০ হাজার টাকা নিয়ে শুরু করলেও এখন কয়েক লাখ টাকার সরঞ্জাম ও আসবাব রয়েছে। প্রথমে আমি একা শুরু করলেও এখন পাঁচজন কাজ করছেন। প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজারের বেশি আয় করি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]