ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

আগুনপাখির গল্প-উপন্যাস
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২১, ১২:৪৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 98

হাসান আজিজুল হক বাংলা কথাসাহিত্যের এক যুবরাজ। ষাটের দশকে তিনি কথাসাহিত্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন করেছেন- যাকে বলা হয় নির্মাণ ধারার সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত কথাসাহিত্যিক। তিনি সৃষ্টি করেছেন এক নব ভাষাশৈলী- যা একজন আজিজুল হকের নিজস্ব ভঙ্গিকেই উপস্থাপন করে। হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যে ঠাঁই পায় সেসব মানুষ যারা বিরূপ নির্মমতার শিকার, যাদের জীবন কাটে আর্থিক অভাব-সঙ্কটে। তিনি তাদের কথায় বলতে চান যাদের জীবন নিপীড়ন, অভাব-বঞ্চনার শিকার, চোর, ভিক্ষুক, দিনমজুর ও চাষি হয়ে ওঠে তার গল্পের মূল্য উপাদান। 

হাসান তার গল্প বয়ানে সামান্য কিছুকেই মুহূর্তে অসামান্য বানিয়ে ফেলতে পারেন- আজিজুল হক নিজের চোখে দেখেছেন মানুষের এই যাতনাময় জীবন যে কারণে তিনি বারবার বলতে চেয়েছেন এসব সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের গল্প। এসব গল্প মানুষ শুনতেও চায়- এ জন্যই তো গোগ্রাসে মানুষ হাসান আজিজুল হকের গল্পকে গ্রহণও করে নিয়েছেন। আমি হাসান আজিজুল হকের প্রথম পড়েছি ‘শকুন’ গল্পটি; যা তার প্রথম প্রকাশিত গল্প। এই গল্পে তিনি সমাজের সেসব নিম্নশ্রেণির মানুষের কথাই বলার চেষ্টা করেছেন। যেখানে তিনি বলতে চেয়েছেন শোষক-শোষিতের লড়াইয়ের কথা। তিনি তার গল্পে দেশভাগ, মা মাটি, রাজনৈতিক বিভাজন, দেশান্তর কিংবা লুটপাট, উচ্ছেদ, অপমান, ধর্ষণ, অপহরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এই লেখকের গল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গল্প ‘আত্মজা একটি করবী গাছ’। এই গল্পটিও রাজনৈতিক বিভাজন দেশভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। লেখক বাস্তবতার পথ ধরেই বলে যান জীবনের এসব যাপননির্ভর গল্প।

তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন ঠিকই কিন্তু তার মন-মনন গঠিত হয়েছে রাঢ়বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি বা ভূপ্রকৃতি দ্বারা। গ্রামীণ জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখা বলেই তিনি জীবনের অভিজ্ঞতায় নিজেকে সাজিয়েছেন একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে। হাসান আজিজুল হক ‘আত্মজা একটি করবী গাছ’ গল্পে বলতে চেয়েছেন দেশভাগের ছিন্নভিন্ন জীবন মানুষকে জীর্ণশীর্ণ করে তোলে আর কান্নাজড়িত চোখে ভাসে নিজের ফেলে আসা জীবনের কথা... ইনাম, ফেকু আর সুহাস নাপিতের জীবনেরই এক নির্দয় অভিজ্ঞতাকে লেখক তুলে ধরেছেন এই গল্পে; যা গল্প বর্ণনায় ‘আত্মজা একটি করবী গাছ, দেশভাগের পরবর্তীকালের কোনো এক সময়কেই আশ্রয় করে গল্পের ডালপালা বিকশিত হয়েছে। মানুষের এই যে রাজনৈতিক বিভাজিতের ফেরে পড়ে অলিখিত জীবন আখ্যান নিয়ে মানুষকে ঘুরতে হচ্ছে- এখান হতে সেখানে যে অনিশ্চিত জীবনের কথা কারও জানা নেই। এ গল্পের শেষের দিকে করবী বিচি যেন আত্মহননেরই একটি প্রতীক বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বৃদ্ধের জীবনযুদ্ধে পরাস্ততায় যেন- করবীর বিচি খেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন। করবী গাছের চমৎকার বিচি হয়- এই কথা বলে যখন ‘পানিতে ডুবে যেতে যেতে, ভেসে যেতে থাকে বুড়োর মুখ’, ইনাম তখন তেতো গলায় প্রশ্ন রাখে, ‘এ্যাহন তুমি কাঁদতিছ... ইনাম যেন বলছে, ‘এ্যাহন কান্দো ক্যা, আগে ভাইবে কাজ করলি তো আর কানতি হত না’! এই গল্পে দেশভাগ একটি নীরবভাবে প্রকাশিত হলেও তা আমাদের কঠিন জীবনের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দেয়- যা একজন হাসান আজিজুল হকের পক্ষেই সম্ভব। 

জানা যায়, ১৯৬০ সালে ‘বৃত্তায়ন’ নামে একটি ছোট উপন্যাস লিখলেও তিনি নিজেই এর বড় সমালোচক হয়ে ওঠেন। এ রচনাকে তিনি নিজেই উপন্যাস হিসেবে অস্বীকার করে থাকেন। তবে আগুনপাখি উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। এ উপন্যাসের জন্য তিনি ২০০৮ সালে কলকাতা থেকে ‘আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়। বৃত্তায়নের মতো ‘শিউলি’ নামে একটি ছোট উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। তবে ‘শামুক’ উপন্যাসটি ২০১৫ সালে প্রকাশিত হলেও এটিই হাসান আজিজুল হক প্রথম রচনা করেছিলেন। প্রথমে উপন্যাসটি অংশবিশেষ একটি লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিতও হয়েছিল। পরে তিনি রচনাটি আর কোথাও প্রকাশ করেননি। একসময় চন্দন আনোয়ারের সম্পাদনায় উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে।

তার আলোচিত গল্পগ্রন্থগুলো হচ্ছে- সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য (১৯৬৪), আত্মজা ও একটি করবী গাছ (১৯৬৭), জীবন ঘষে আগুন (১৯৭৩), নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৭), আমরা অপেক্ষা করছি (১৯৮৮), রাঢ়বঙ্গের গল্প (১৯৯১), রোদে যাবো (১৯৯৫), হাসান আজিজুল হকের শ্রেষ্ঠগল্প (১৯৯৫), মা মেয়ের সংসার (১৯৯৭), বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প (২০০৭)। গল্পের চেয়ে তার উপন্যাসের সংখ্যা কম হলেও ঔপন্যাসিক হিসেবে কম আলোচিত নন হাসান আজিজুল হক। সব মিলিয়ে তিনি পাঠকের অন্তরে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন।


আরও সংবাদ   বিষয়:  হাসান আজিজুল হক  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]