ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১ ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

আবদুলরাজাক গুরনাহর গল্প 'সহচর'
ভাষান্তর: পারভজে আহসান
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, ২০২১, ১:৪৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 172

মনে হয় সে আমাকে দেখেছিল। অন্য যেকোনো কারণে সে ইশারা দেয়নি। গাড়ির পেছনের দরজার কাছে আমি দাঁড়ালাম। বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল। আমি স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম। এটি অপছন্দের কারণে নয়। এটি হচ্ছে বেঁচে থাকার ক্লান্তিজনিত হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া একধরনের বিরক্তিবোধ। সে জানতে চাইল আমি কোথায় যাব। আমি হোটেলের নাম বলতেই সে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিল। তার পাশে সামনের একটি সিটে বসলাম। সেও বুঝতে পারল বিরক্তি বোধ করার মতো তেমন ব্যক্তি আমি নই। গাড়িটা ভীষণ জরাজীর্ণ ছিল। সিটের কোনাগুলো কাঁচা চামড়ার মতো কুঁকড়ে গেছে। দুপুরের খাবারের সময়ে অধিক যানবাহনের ভিড়ে আস্তে আস্তে গাড়ি চলার কারণে হাঁটুর ওপর রাখা আমার ব্রিফ কেসের দিকে সে তাকাল। গলার স্বর পরিবর্তন করে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘কোত্থেকে এসেছ?’ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমি তার দিকে তাকালাম। তার মুখে ক্রোধ ও যন্ত্রণার ছাপ দেখে বুঝতে পারলাম সে খুব বিপদের মধ্যে আছে। আমি ভীষণ ভয় ও বিরক্তি বোধ করছিলাম। সে আমার কেসের দিকে তাকিয়ে একটি মুচকি হাসি দিল। আমার কেসের দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে আবারও বলল, ‘কোত্থেকে?’ আমি বললাম, ‘ইউনারিজা, ইংল্যান্ড।’ আমি খুব নম্রভাবে কথা বলছিলাম। আমি যে তার সঙ্গে কথা বলতে মোটেও আগ্রহী নই তা বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। সে আবারও বলল, ‘তুমি কি ছাত্র?’ ‘না, আমি একজন শিক্ষক।’ সে ভেবেছিল আমি সমৃদ্ধির জন্য এখানে এসেছি। 

দুপুরের খাবারের সময় মানুষেরা খুব তাড়াহুড়ো করছিল। একদল ভারতীয় স্কুলবালক প্রাণবন্তভাবে গল্প করছিল, তারা বাঁশি বাজাচ্ছিল। রাস্তায় ছুটন্ত গাড়িকে তোয়াক্কা না করেই তারা রাস্তা অতিক্রম করছিল। গাড়ি চলাচলের জন্য ড্রাইভারকে হর্ন বাজাতে হচ্ছিল। পোস্ট অফিসের কাছে যানযট লেগে থাকে। অসংখ্য মানুষ ফুটপাথ দিয়ে চলাচল করে। টাই ও শার্ট পরিহিত কিছু মানুষ তড়িঘড়ি করে ছুটে যাচ্ছিল। ব্যস্ততা, শুধুই ব্যস্ততা। আমার হোটেলের কাছে রেল টার্মিনালের দিকে মোড় নেওয়ার সময় গানের সুরে সে ‘ইউনারিজা’ শব্দটি উচ্চারণ করল। সে আবারও বলল, ‘ইউনারিজা, বিলাসিতার এক জায়গা।’ ‘তুমি কি কখনও সেখানে গিয়েছ?’ আমার এ প্রশ্নে ছিল এক বিস্ময়কর অবিশ^াস। ঠিক সেই সময়ে গাড়িচালক রাস্তা থেকে পানি বিক্রেতার গাড়িকে সরানোর জন্য হর্ন বাজাচ্ছিল। কিছুক্ষণের জন্য পানি বিক্রেতার সঙ্গে ঝগড়া, চিৎকার-চ্যাঁচামেচি ও জানালার বাইরে হাত নাড়ানোর মধ্যেই নিমগ্ন ছিল লোকটি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইংল্যান্ডে কি তোমার কোনো আত্মীয়স্বজন আছে?’ আমি কল্পনা করতে পারিনি, যে ব্যক্তি একটি লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি চালাচ্ছে সে সেখানে যেতে পারে। ‘আমি তো সেখানে থাকতাম।’ একথা বলে সে আমার দিকে তাকাল এবং হাসল। আমরা তখন প্রধান সড়ক ছেড়ে রেল গুদামের পেছন দিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় বড় বড় গর্ত এবং রেললাইনের কারণে তাকে গাড়ি চালানোয় মনোযোগ দিতে হচ্ছিল। সে কিছু বলতে চাইল। খারাপ রাস্তার কারণে গল্পটি শুরু করতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর সে বলা শুরু করল, ‘এক মালয়া অর্থাৎ ইউরোপীয় এক পতিতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। সে আমাকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এমনকি অস্ট্রেলিয়াতে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। তুমি মানুষের কাছ থেকে এদের গল্প শুনেছ। তুমি মনে মনে ভাবতে পার তারা মিথ্যে বলছে। মালয়া মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক না হওয়ার আগ পর্যন্ত আমিও তাই ভাবতাম।’ ঠিক সে সময়ে গাড়িটা হোটেলের সামনে থামল। তারপরও স্মৃতি আস্বাদনের প্রসন্নতা ছড়িয়ে পড়ল তার মুখ জুড়ে। ‘আমার নাম সেলিম। আমি সবসময় পোস্ট অফিস ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে থাকি।’ একথা বলে সে চলে গেল।

আমি অপ্রত্যাশিতভাবে এই হোটেলটি পেয়েছিলাম। ইমিগ্রেশন অফিসার বলল, এ দেশে কোনো ঠিকানা না দিলে সে প্রবেশানুমতি দিতে পারবে না। পাসপোর্টে আমার জন্মস্থান জানজিবার নামটি দেখে বিনয়ের সঙ্গে সে একথাটি বলেছিল। জানজিবারে তার আত্মীয়স্বজন রয়েছে। সে অনেকগুলো হোটেলের ঠিকানা দিয়েছিল। সেখান থেকে এ হোটেলের ঠিকানা পেয়েছিলাম।

পরের দিন সন্ধ্যায় ভিজিটর আসায় রিসিপশনিস্টের কল পেয়ে বিস্মিত হলাম। মনে মনে ভাবলাম সেলিম ছাড়া আর কেউ নয়। ঠিক তাই হলো। সাদা ফুলের প্রিন্ট করা সবুজ সিল্কের কাপড় দিয়ে বানানো জামা এবং জিন্স প্যান্ট পরে অপেক্ষা করছিল সেলিম। সে আমার জন্য এক বোতল পানীয় কেনার ইচ্ছে প্রকাশ করল। সিল্কের শার্ট এবং নীল জিন্স প্যান্ট দেখিয়ে বলল, তার মালয়া এগুলো কিনে দিয়েছিল। সে বলল, ‘তুমি কি জানতে চাও কীভাবে আমি তাকে পেয়েছি?’ আমি সম্মতি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বলা শুরু করল, ‘তামবিল হোটেলের বাইরে সে কারও জন্য অপেক্ষা করছিল। তখন তার কাছে যাই। কথা বলি। এক পর্যায়ে সে আমার গাড়িতে উঠে পড়ল। তাকে নিয়ে সারা দিন গাড়ি চালালাম। সন্ধ্যায় তাকে হোটেলে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় সে আমাকে সমুদ্রসৈকতে নিয়ে যায়। প্রত্যেক দিন অন্ধকারে সমুদ্রসৈকতে আমরা অন্তরঙ্গ হয়ে পড়তাম। 

আমি অনিচ্ছাকৃতভাবে বললাম, ‘সমুদ্রসৈকতে তুমি খুব ভালো সময় কাটিয়েছ।’ আমি তার পানীয় দ্রব্যের মূল্য পরিশোধ করলাম। তার স্বামীর সঙ্গে তালাক হওয়ায় সে ভালো অঙ্কের টাকা পেয়েছিল। সেই টাকা দিয়ে সে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে তার জন্মস্থান লিভারপুলে সেলিমকে নিয়ে গিয়েছিল। সে তাকে খুব ভালোবাসত। তারা দুজনে বিলাসী জীবনযাপন করছিল। তারপর চিঠি লেখার কথা বলে সেখান থেকে চলে গেলাম।
পরের দিন সন্ধ্যায় সে আবারও আসল। আমি হোটেলে নেই তা জানিয়ে দেওয়ার জন্য রিসেপশনিস্টকে বলেছিলাম। আনুগত্যের কারণে তাকে একথাটি বলতে পারেনি। তার শার্টটি দেখিয়ে বলল, ‘আমি এ শার্টটি অস্ট্রেলিয়া থেকে কিনেছি। আমরা কিছুদিন ফ্রান্সে থাকার পর সেখানে গিয়েছিলাম। তার নাম বেট্টি। বেথনি হচ্ছে একটি ধর্মীয় নাম। কিন্তু সে বেট্টি হিসেবে পরিচয় দিত।’ পরের দিন সে আমাকে অন্য একটি ক্লাবে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে সে কিছুটা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিল।

ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে আমার হাতে মাত্র দুদিন সময় ছিল। সেলিম আসার আগেই আমি প্রস্তুত ছিলাম। সে গাড়ি ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ পর আমি বুঝতে পারলাম, সে মূল রাস্তা ছেড়ে অন্য পথ দিয়ে যাচ্ছে। এটি একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা ছিল। আস্তে আস্তে চারপাশ অন্ধকারে ডুবে গেল। রাস্তার দুপাশে ছিল ঝোপঝাড়। দীর্ঘক্ষণ চলার পর একসঙ্গে চার-পাঁচটি ঘর দেখা গেল। সে গাড়িটি থামাল। ঘরগুলোতে কেরোসিনের প্রদীপ জ্বলছিল। সেখানে মজিদ ও বুড্ডা নামে দুই ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর এক মধ্যবয়সি মহিলা এসে হাজির হলো। তাদের সঙ্গে মজার গল্প বলার পর খাবার তৈরির জন্য সে চলে গেল। টেবিলের ওপর কয়েকটি ওয়াইনের বোতল পড়েছিল। আমি অন্যরকম এক পরিবেশ আন্দাজ করতে পারলাম। ভেতরের রুম থেকে দুটো বিয়ারের ক্যান নিয়ে ছেঁড়া জামা পরিহিত একটি মেয়ে এসে হাজির হলো। তার চোখে কোনো ভাষা নেই। কেবল ধু-ধু প্রান্তর। মেয়েটি পেছনের কক্ষে যাওয়ার সময় মজিদ তাকে অনুসরণ করল। হঠাৎ মেয়েটির চিৎকারে কেরোসিনের প্রদীপ কেঁপে উঠল। আমি সেখানে আর থাকতে চাইলাম না। সেখান থেকে সেলিম আমাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নিয়ে গেল। ঢাকঢোল বাজিয়ে কনে বাড়িতে বরের আগমনের দৃশ্য উপভোগ করলাম। কনের দিকে তাকিয়ে সেলিম বলল, ‘সে আমার স্ত্রীর এক আত্মীয়া।’ ‘বেথনির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার আগে কি তুমি বিয়ে করেছিলে?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, অনেক আগে আমি বিয়ে করেছিলাম। আমি কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে পারতাম না। কেবল রক্তপাত হতো।’ ‘তুমি কি ডাক্তারের কাছে গিয়েছ?’ ‘কীসের ডাক্তার? এখানে কোনো ডাক্তার নেই।’ লাজুক কণ্ঠে সে বলল, ‘আগামীকাল তুমি কি আমাকে নিয়ে যাবে? আমি সেখানে ডাক্তার দেখাব। তুমি যা চাও আমি তাই করব।’

আমি পরের দিন নিজেই এয়ারপোর্টে চলে যাবÑ একথা জেনেও সে পরের দিন আসল। গাড়ি পার্ক করে সে আমার পাশে হাঁটাহাঁটি করছিল। সে বলল, ‘আবার এসে আমাকে নিয়ে যেয়ো। এক্ষেত্রে কত টাকা লাগবে? আমি সব খরচ পরিশোধ করব।’  আমি সেই দেশের মুদ্রার একটি প্যাকেট তুলে দিলাম। সে বিস্ময়বোধ করল। আমি বললাম, ‘তুমি এই টাকা দিয়ে ভালো কিছু করতে পারবে। ‘পরবর্তীতে এসে তুমি দীর্ঘদিন থাকবে’ একথা বলে সে চলে গেল। 


আরও সংবাদ   বিষয়:  গুরনাহর গল্প  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]