ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

শেখ রাসেল বেঁচে থাকবেন আমাদের মধ্যে
মোতাহার হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, ২০২১, ৯:৩৭ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 179

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিন ছিল ১৮ অক্টোবর। ১৯৬৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের ‘বঙ্গবন্ধু ভবনে’ শেখ রাসেল জন্মগ্রহণ করেন। শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে এখন তার বয়স হতো ৫৮ বছর। ৫৮ বছরে পরিণত বয়সের একজন মানুষ সমাজ, সংসার, দেশ ও জাতিকে অনেক কিছুই দিতে পারতেন। কিন্তু শেখ রাসেলের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ হয়নি। বরং মাত্র ১০ বছর বয়সে জীবন, সমাজ, সংসার ও পৃথিবী সম্পর্কে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানবতার ঘৃণ্য শত্রু-খুনি-ঘাতক চক্রের নির্মম বুলেটের হাত থেকে রক্ষা পাননি বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নরপিশাচরা নিষ্ঠুরভাবে শিশু রাসেলকেও হত্যা করেছিল। মৃত্যুকালে তিনি ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন।

এ নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে বাবা, মা, ভাই, ভাবিদের হত্যাকাণ্ড স্বচক্ষে দেখতে হয়েছে রাসেলকে। বাসার কাজের লোকদের সঙ্গে তাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে। সে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদতে থাকে। ঘাতকদের কাছে আকুতি করে, ‘আমি মায়ের কাছে যাব, আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যান।’ তখন ঘাতকরা তাকে মৃত মায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে গুলিতে তার বুক ঝাঁজরা করে দেয়। দশ বছর বয়সি শিশুটির জীবনপ্রদীপ ঘাতকরা নির্মমভাবে নিভিয়ে দেয় চিরদিনের জন্য।

বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা শেখ রাসেলকে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তাদের সেই অপচেষ্টা শতভাগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। শহীদ শেখ রাসেল আজ বাংলাদেশের শিশু-কিশোর, তরুণ, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের কাছে ভালোবাসার নাম। অবহেলিত, পশ্চাৎপদ, অধিকারবঞ্চিত শিশুদের আলোকিত জীবন গড়ার প্রতীক হয়ে গ্রাম-গঞ্জ-শহর তথা বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদ-লোকালয়ে শেখ রাসেল আজ এক মানবিক সত্তায় পরিণত হয়েছেন। মানবিক চেতনাসম্পন্ন সব মানুষ শেখ রাসেলের মর্মান্তিক বিয়োগ বেদনাকে হৃদয়ে ধারণ করে বাংলার প্রতিটি শিশু-কিশোর-তরুণের মুখে হাসি ফোটাতে আজ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আজ রাসেলের জন্য কোনো শোকাশ্রু ফেলব না। খুনিরা তাকে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সব অপচেষ্টা আজ শতভাগ ব্যর্থ। খুনি-ঘাতকের আস্তানা ছিন্নভিন্ন করে শান্তি ও মানবিকতার আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রেরণার নামই হচ্ছে শেখ রাসেল।

শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের নাম রাসেল- তাই বাঙালির কনিষ্ঠতম ভূমিপুত্রের নাম শেখ রাসেল। রাসেলের জন্মদিনে তার জন্য অফুরান ভালোবাসা। রাসেলের নির্মম হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সম্ভবত সর্বপ্রথম এবং এ পর্যন্ত সর্বশেষ হৃদয় শিহরন জাগা হত্যাকাণ্ড। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকৃতি যা করেনি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মানবকুলে যা কখনও ঘটেনি, কাদামাটির সোঁদা গন্ধে ভরা বাংলার মাটি তা প্রত্যক্ষ করল- ১৯৭৫ সালের কালরাতের শেষ প্রহরে শেখ রাসেলের হত্যাকাণ্ড।

‘কাকের স্বভাব আর কর্কশ শব্দ’ অনিষ্টের প্রতীক বলে গ্রামীণ সমাজে কুসংস্কার প্রচলিত আছে। তবে সেই কাকের চেয়েও কর্কশ আর অমঙ্গলের মনুষ্যরূপী পশু রয়েছে আমাদের সমাজে। এরা নারী-পুরুষের, শিশুর বর্বর হত্যাকাণ্ডে ব্যথিত হয় না, শিশুদের মাথার খুলি উড়িয়ে দেওয়া খুনিদের বাহবা দেয়। রাসেলের মতো নিষ্পাপ শিশুকে যারা গুলি করে হত্যা করে- সেই নরপশুদের পুরস্কৃত করে, ক্ষমতার ভাগ দেয়। রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে যায় এই ঘাতকরা। ওরা হাতের মেহেদি আর আলতাপরা নববধূর আনন্দকে ক্ষমতার লোভ আর প্রতিহিংসার আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। যে নারী জীবনের সব আনন্দ-ভোগ-বিলাসকে তুচ্ছ জ্ঞান করে মানুষের অধিকার ও বাঙালির স্বাধীনতার জন্য স্বামীকে সঁপে দিয়েছিলেন মহাকালের রথযাত্রায়- তারও জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে এই পাষণ্ড খুনির দল। মাতৃসম এই মহীয়সী নারীর বুক ঝাঁজরা করে দিতে একবারও হাত কাঁপল না এই খুনিদের? ফুলের মতো পবিত্র, নিষ্পাপ শিশু রাসলেকে হত্যা করতে এই পাষণ্ড খুনিদের একটুও হাত কাঁপেনি। বরং হত্যার নেশায় মত্ত এসব নরপশুরা উল্লাসে মেতে ওঠে।

বাবা বঙ্গবন্ধুর অন্তঃপ্রাণ ছিলেন ছেলে শেখ রাসেল। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের বেশি সময় জেলে বন্দি থাকায় শেখ রাসেল বাবাকে বেশি সময় কাছে পেত না। তার ধারণা জেলখানা তার বাবার অন্য একটি বাড়ি। তাই যখন বাবাকে কাছে পেত না তখন বাবা অন্য বাসায় চলে গেছে এই ভেবে তার মন খারাপ হতো। মায়ের সঙ্গে যেদিন সব ভাইবোন মিলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বাবাকে দেখতে যেত, সেদিন ফেরার সময় খুব কাঁদত, একবার তো বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় বেশ মন ভার নিয়ে জেলখানা থেকে বাসায় ফিরে বোনদের বলল, ‘আব্বা আসল না।’ তারা বলত, ‘ওটা তাঁর বাসা, এটা আমাদের বাসা। এখানে পরে আসবেন।’ বাবাকে প্রায়ই গ্রেফতার হয়ে জেলে যেতে হতো। বন্দি করে রাখত। তার জন্মের পর দীর্ঘ সময় বাবা জেলেই কাটিয়েছেন। মুক্ত বাবাকে ভয় পেত শাসকরা। বাবাকে দীর্ঘ সময় দেখতে না পেয়ে তার মন খারাপ থাকত। বাবার কাছে যাওয়ার জন্য অনেক সময় মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে কাঁদত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। স্বপ্নে দেখত, বাবা তাকে গল্প শোনাচ্ছেন, কখনও বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন। তার এই খারাপ লাগাটা ভাইবোনদেরও কষ্ট বাড়াত। বাবার জেলে যাওয়া, মুক্তি পাওয়া জীবনকে অবশ্য তারা সয়ে নিয়েছিল। বাবার অবর্তমানে তাই সে মাকেই আব্বা বলে ডাকত কখনও কখনও। মন খারাপ চাপা দেওয়ার জন্য মায়ের কিনে দেওয়া তিন চাকার সাইকেলটি নিয়ে সারা দিন ব্যস্ত থাকত। কিন্তু রাত হলেই চেহারায় বিষণ্নতার ছাপ থাকত।

সে সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত খুনিদের শাস্তি না দিয়ে পুরস্কৃত করে অদ্ভুত এক কালো আইন জারি করা হয়। ‘পনেরো আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার করা যাবে না, শাস্তি দেওয়া যাবে না।’ পরে দেখলাম খুনিরা রাষ্ট্রদূত হলো, এমপি হলো, রাজনৈতিক দল গঠন করল- আরও কত কী? কে তাদের এসব সুযোগ করে দিয়েছিল? তিনি আর কেউ নন, অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক আর জেনারেল জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকারী খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, পুরস্কৃত করেছে। মূলত ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে নেপথ্যে জিয়াই জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছে। সেই ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের জন্মদিনে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। একই সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ‘বঙ্গবন্ধু ভবনে’ ঘাতকের বুলেটে নির্মমভাবে শহীদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের অপরাপর সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকসহ সর্বস্তরের মানুষ শেখ রাসেলের কথা স্মরণ করে এ দেশের শিশুদের অধিকার বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করুক। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর কোনো শিশুই যেন এভাবে হত্যার শিকার না হয়, তারা যেন অত্যাচার ও বঞ্চনার শিকার না হয়। অসহায়ত্বের মাঝে যেন তাদের পড়তে না হয়। সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া হলে শেখ রাসেলের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে।

লেখক: সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]