ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

মানুষের চোখে মুখে আতঙ্ক, প্রতিবাদে উত্তাল রংপুর
দুটি মামলা, ৪২ গ্রেফতার, ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২১, ৬:১৬ পিএম আপডেট: ১৮.১০.২০২১ ৯:৩০ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 297

পীরগঞ্জের তিনটি গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রংপুরের মানুষের চোখে মুখে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে দিনব্যাপী বিক্ষোভ, মানব বন্ধনে উত্তার ছিল পুরো রংপুর।

সোমবার (১৮ অক্টোবর) পীরগঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণে নেয় পুরো উপজেলা। এর আগে রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও বসতবাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর থেকে সেখানের বাসিন্দারা আতঙ্কে সময় পার করছেন। আগুনে পুড়ে গেছে ২১টি বাড়ি। এ ঘটনায় আজ সোমবার পর্যন্ত অন্তত ৪২ জনকে আটক করা হয়েছে। দুইটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, পাশের মাঝিপাড়া গ্রামের এক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট দিয়েছেন—এমন অভিযোগ তুলে একদল লোক সেখানে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করেন। ঘটনা আঁচ করতে পেরে সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে পুলিশ মাঝিপাড়া গ্রামের ওই তরুণের বাড়িসহ আশপাশের বাড়িতে নিরাপত্তা দেয়। তখন উত্তেজিত শত শত লোক ওই গ্রামের পাশের বড়করিমপুর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে বসতবাড়িতে ঢুকে দুর্বৃত্তরা গ্রামজুড়ে তাণ্ডব চালায়। এ সময় তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে মারধর করে, হুমকি দেয়, অকথ্য ও আপত্তিকর ভাষায় গালাগাল করে। প্রাণ বাঁচাতে নারী, পুরুষ ও শিশুরা বাড়ি ছেড়ে পাশের ধানখেতে আশ্রয় নেয়। দুর্বৃত্তরা তখন একের পর এক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, হামলাকারীরা গ্রামের বসতবাড়িতে ঢুকে অন্তত আধা ঘণ্টা ধরে তাণ্ডবলীলা চালালেও পুলিশের ভূমিকা তাদের চোখে পড়েনি । হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর পুলিশ গ্রামে গেলে ধানখেতে আশ্রয় নেওয়া লোকজন বাড়িতে ফেরে। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, আজ সকাল পৌনে ছয়টার দিকে ওই গ্রামে ঢুকতেই নারী, পুরুষ ও শিশুদের আহাজারি শোনা গেল। নন্দ রানী (২৩) ও তার শাশুড়ি সুমতি রানী (৫৫) বুক চাপড়ে আহাজারি করছিলেন। দেখা গেল, সুমতির তিন ছেলের টিনের চারটি বসতঘর ও ঘরগুলোর ভেতরে থাকা যাবতীয় জিনিস পুড়ে গেছে। আগুনে পুড়েছে তাঁদের দুটি গাভি। যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সংসারের চাকা ঘুরত, সেটিও পুড়ে শেষ।

সুমতির ছেলে প্রদীপ চন্দ্র বলেন, রাতে শত শত মানুষ ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এ সময় দুজন তাকে মারধর করলে তিনি দৌড়ে কোনোমতে রক্ষা পান। পরিবারের অন্য সদস্যরাও ভয়ে বাড়ি থেকে চলে যান। হামলাকারীরা ঘরে থাকা ২৫ হাজার টাকা, টিভি ও একটি গরু নিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

একটু এগুতেই দেখা যায়, আরেক বাড়িতে কান্নার শব্দ। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, একটি শিশু ও এক নারী পোড়া ঘরের বারান্দায় বসে কাঁদছেন। ওই নারীর নাম তারা রানী। শিশু বর্ষা রায় (৯) তার মেয়ে।  স্ত্রী-সন্তানকে ব্যর্থ সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন ননী গোপাল রায়। তিনি জানান, তার চারটি টিনের ঘর, ধান, চাল ও আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তারা রানী আহাজারি করে বলছিলেন, ভগবান, আমরা কী দোষ করছিলাম? কেন আমাদের সব শেষ করে দিল। এখন আমরা কোথায় থাকব, কী করব, কী খাব?

ননী গোপাল বলেন, তিনি ঘটনার সময় বাড়িসংলগ্ন রাধাগোবিন্দ মন্দিরে পূজা করছিলেন। হঠাৎ শত শত লোক দল বেঁধে বাড়ি ও মন্দিরে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয়। লুট করে নিয়ে যায় গরু ও স্বর্ণালংকার। পরনের কাপড় ছাড়া সব পুড়ে গেছে। থানায় ফোন করলেও পুলিশের সহযোগিতা পাননি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

গ্রামের ক্ষুব্ধ শিরীষ চন্দ্র রায় বলেন, পুলিশ এসেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের সবকিছু শেষ হওয়ার অনেক পরে। এখন গ্রাম পুলিশে ঠাসা। লাভ কী!

ওই গ্রামের বাসিন্দা রাসেল মিয়া (৩৫) ঘটনার অভিন্ন বর্ণনা দিয়ে বলেন, হিন্দুদের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও আগুন লাগানোর ঘটনা মর্মান্তিক। এমন নিষ্ঠুরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

পূর্ণিমা রানী বলেন, হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে তার দুই তরুণী মেয়ে কোথায়, তা জানতে চায়। ঘরে ঢুকে ভাঙচুর করে ৫০ হাজার টাকা ও একটি গরু নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গ্রামের নিরঞ্জন রায় বলেন, ১৫টি পরিবারের ২১টি বসতঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। গ্রামের অন্তত ৫০টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। হামলাকারীরা অন্তত ২৫টি গরু ও ১০টি ছাগল নিয়ে গেছে।

পাশের মাঝিপাড়া গ্রামের তরুণ, যার পোস্টকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ঘটল, সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তালা ঝুলছে। পাশে বসে আছেন অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যরা। 
এই গ্রামের পুলিন চন্দ্র বলেন, ওই তরুণ ও তার পরিবারের সদস্যরা গতকাল সন্ধ্যার পর বাড়িতে তালা লাগিয়ে অন্যত্র আত্মগোপন করেছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে ঠাঁই এখন খোলা আকাশের নিচে।

রংপুরের পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, হামলাকারীদের কোনো ছাড় নেই। তারা হানাদার বাহিনীর মতো বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে। ইতিমধ্যে অভিযান চালিয়ে অন্তত ৪২ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায়  দুটি মামলা দায়ের হয়েছে।  অন্যদিকে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে সকাল থেকে বাসদ, ইস্কন সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, মানব বন্ধন করেছে। অপরাধীদের শাস্তি দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রংপুর।

 এঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রধান এবং রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ওয়াব মিয়া সময়ের আলোকে বলেছেন অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে প্রশাসন।


আরও সংবাদ   বিষয়:  রংপুর   পীরগঞ্জ     




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]