ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

রাসুলের (সা.) প্রতি ভালোবাসা কেমন হবে
মওলবি আশরাফ
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২১, ১১:২৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 192

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিত তা তিনি নিজেই হাদিসে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না তার কাছে বাবা-মা, সন্তানাদি ও সবার চেয়ে আমি বেশি প্রিয় না হব।’ (বুখারি : ১৫)। তার মানে ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্য বুনিয়াদি শর্ত হলো আল্লাহর রাসুলকে মহব্বত করা। নামেমাত্র মহব্বত নয়; একজন মানুষের সবচেয়ে আপন হয় তার বাবা-মা, তারপর সন্তানাদি, তারপর অন্য কোনো মানুষ,  তাদের সবার চেয়ে আল্লাহর রাসুলের প্রতি বেশি মহব্বত হতে হবে এবং সেটা আবার মুমিন হওয়ার পূর্বশর্ত।

পবিত্র কোরআনেও একই নির্দেশনা আছে, মুমিনের জন্য ভালোবাসার মূল কেন্দ্র স্বয়ং আল্লাহ, তারপর হজরত মুহাম্মদ (সা.)। আর বাকি দুনিয়ার যত প্রেমময় মানুষ আছে, যতরকমের ভালোলাগার জিনিস আছে- সবকিছুর অবস্থান দ্বিতীয়তে। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর রাসুলকে ভালোবাসা আমাদের প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। কেননা দুনিয়াতে ভালোবাসার যত কিছু আছে তার সবই তার কারণে প্রেমময়। যদি তিনি আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসতে না বলতেন, আত্মীয়তা ছিন্ন করতে না বলতেন, সামাজিকভাবে এক থাকতে না বলতেন, আশরাফ-আতরাফ, ধনী-গরিব, সাদা-কালো ভুলে গিয়ে এক কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়তে না বলতেন- আমাদের মধ্যে এসব করার আগ্রহই তৈরি হতো না। আমরা তখন হতাম বিচ্ছিন্ন, শক্তিহীন, আমাদের কোনো সুখ থাকত না।

মানুষ সামাজিক প্রাণী বটে, নিজ প্রয়োজনে দলবদ্ধ হয়ে থাকে। কিন্তু আটলান্টিকের এই পাড় থেকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত ভাই ভাইয়ের সম্পর্ক ও স্বর্ণময় এক সভ্যতা গড়ে তোলা তার চেয়ে অনেক বড় বিষয়। আর তা একমাত্র সম্ভব হয়েছে রাসুলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা থাকার কারণে। এই শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে কখনও তার ওপর জুলুম করে না এবং জালিমের হাতে তাকে ছেড়ে দেয় না।’ তারপর বলেছেন, ‘এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য প্রাচীরের মতো, যার একাংশ অপরাংশকে শক্তি জোগায়।’ (বুখারি : ৫/৯৭-৯৯)

ভালোবাসা দুই ধরনের হয়- ১. স্বভাবজাত ও ২. মস্তিষ্কজাত। বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তানাদির প্রতি ভালোবাসা স্বভাবজাত। আপনি জন্মলাভ করে যাদেরকে দেখেছেন আপনাকে জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, বিপরীতে তার প্রতিও ভালোবাসা তৈরি হয়ে যাবে। তারপর নারী ও পুরুষের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ স্বভাবজাত, আল্লাহ তায়ালাই বংশবৃদ্ধি ও মানবজীবনকে উদ্দেশ্যময় বানাতে এই নিয়ম তৈরি করেছেন। সন্তানাদির প্রতি ভালোবাসাও একই রকম, মানুষ তাদেরকে নিজেরই অংশ মনে করে, সন্তানের মুখে নিজেরই ছায়া দেখে, এই কারণে তাদের ভালোবাসে। এসব ভালোবাসায় মস্তিষ্কের ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু মানুষ যদি মস্তিষ্কের ব্যবহার করে কাউকে ভালোবাসে, সেই ভালোবাসা স্বভাবজাত ভালোবাসা থেকে একদম আলাদা আর কঠিন হয়। সেখানে থাকে আদর্শ ও বিশ্বাস। সেই ভালোবাসা মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই ভালোবাসার জন্য মানুষ বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানদেরও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কেননা সেখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বাস; আর বিশ্বাসই মানুষের চালিকাশক্তি, প্রসেসর, একে ছাড়া চলা সম্ভব নয়।

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর প্রতি আমাদের মহব্বত ও ভালোবাসা মস্তিষ্কজাত। তাই তো সাহাবায়ে কেরাম তাঁর প্রতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে এভাবে জান উৎসর্গ করেছিলেন, তাকে ছাড়া দুনিয়ার কোনো কিছুর পরোয়া করেননি। এই ভালোবাসার শক্তিতেই হজরত আবু বকর (রা.) ঘরের যাবতীয় সহায়-সম্বল আল্লাহর রাসুলের কদম মোবারকের সামনে রেখেছিলেন। ‘ঘরে কী রেখে এসেছ’ জিজ্ঞেস করা হলে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে।’ হজরত হানজালা (রা.) যেই আল্লাহ রাসুলের আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার খবর শুনেছেন, বাসরঘরে নববধূকে ফেলে রেখে ছুটে গিয়েছিলেন রণাঙ্গনে, পেছনে ফিরেও তাকাননি। প্রায় প্রত্যেক সাহাবির জীবন ও কর্মে এমন ভালোবাসার উদহারণ আমরা পাই। কেউ বাবা-মাকে ত্যাগ করেছিলেন, কেউ ধনাঢ্য জীবন, আবার কেউ স্ত্রীকে, কেউবা প্রিয়তমাকে। কারণ একটাইÑ রাসুলের প্রতি তাদের মস্তিষ্কজাত ভালোবাসা, যা সব ভালোবাসার ঊর্ধ্বে।

কিন্তু মস্তিষ্কজাত ভালোবাসা প্রগাঢ় হতে পারে কেবল মস্তিষ্কের ব্যবহারেই। আর মস্তিষ্ক তখনই কেবল সচল হবে যখন বেশি বেশি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ সম্পর্কে জানবে, তার সিরাত পাঠ করবে। কারণ পরিচয়-পরিচিতি অর্জন ব্যতিরেকে কারও প্রতি মাস্তিষ্কজাত ভালোবাসা তৈরি হতে পারে না। বর্তমান সময়ে আমাদের বিভিন্ন সঙ্কটের কারণও আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবন সম্পর্কে ধারণা না থাকা। তিনি ঠিক কীভাবে সংসার ও সমাজে চলার আদর্শ-পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, ব্যক্তিজীবনে আল্লাহর বাণীর প্রয়োগ কীভাবে ঘটিয়েছিলেনÑ তা যদি আমরা না-ই জানি তাহলে কীভাবে আমরা তার অনুসরণ করব? শুধু পোশাক-আশাকের অনুসরণ ভালোবাসার প্রকাশ নয়, প্রকৃত ভালোবাসা আল্লাহর রাসুলের কর্মপন্থা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব। 

কিন্তু সেই অবস্থান থেকে আমরা দিনদিন আরও দূরে সরে যাচ্ছি, আমাদের মুখেই শুধু ভালোবাসার প্রকাশ, অন্তর একদম ফাঁকা। রাসুলের প্রতি ভালোবাসা আমাদের পরস্পরকে এক করার বদলে খণ্ড খণ্ড দলে ভাগ করছে, ভাইয়ের ওপর ভাই জুলুম করছে। এই ঝগড়া-ফাসাদের কারণ একটাইÑ যাকে আমরা ভালোবাসার দাবি করি তাঁর জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে আমাদের প্রকৃত জ্ঞান না থাকা। যদি তাঁকে জানতাম, তাহলে তাঁর নিষেধ করা কাজ কিছুতেই সমর্থন করতাম না। তো আমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই ঈমানদার হতে চাই, ইহকাল ও পরকালে কামিয়াব হতে চাই, তাহলে আমাদের উচিত আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে জানা এবং সব ভালোবাসার ঊর্ধ্বে তাঁর ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেওয়া। আল্লাহ আমাদের আমল করার তৌফিক দান করুন।


আরও সংবাদ   বিষয়:  রাসুল (সা.)   মহানবী     




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]