ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৪ অক্টোবর ২০২১ ৯ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ২৪ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি তরুণ সমাজের জন্য অশনিসঙ্কেত
সৈয়দ ফারুক হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২১, ১০:৫৯ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 212

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের আধুনিক জীবনের এক নতুন বাস্তবতা। প্রযুক্তির কল্যাণকর দিকগুলো অবশ্যই অস্বীকার করা যাবে না। আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে উন্নত সভ্যতা, বাড়িয়েছে জীবনযাত্রার মান কিন্তু কেড়ে নিয়েছে জীবনের সব আবেগ। সারা বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭০ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। তরুণদের মধ্যে এ হার আরও বেশি, প্রায় ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষের রয়েছে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। চারপাশে, দেশে-বিদেশে কী ঘটছে, সেগুলো ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, গুগলসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে যাচ্ছে সবাই। এমনও কিছু আছে যা ভাইরাল ওয়ার নয়, তাও ভাইরাল হচ্ছে। বর্তমানে অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থাকলেও ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, লিঙ্কডিন, স্কাইপ ইত্যাদিই বেশি জনপ্রিয়। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে বর্তমানে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ফেসবুক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনেক নেতিবাচক দিক রয়েছে। বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের কারণে হাজারো তরুণ-তরুণী বিপথগামী হচ্ছে, মানসিক সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে, খেলাধুলা ছেড়ে দিয়ে দিনরাত ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। অতিসম্প্রতি সিএনএন এ বিষয়ে সতর্কতামূলক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ বয়সে কিশোর-কিশোরী, যারা অল্প সময়ে কিছু একটা করে দেখানোর মনোভাব নিয়ে থাকে। ফলে অনেক সময় সাইবার অপরাধীদের ফাঁদে পড়ে অপরিসীম ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হলো কম্পিউটারকেন্দ্রিক এক ধরনের প্রযুক্তি যা ভার্চুয়াল কমিউনিটি এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে মানুষকে বিভিন্ন তথ্য, ধারণা, ক্যারিয়ার-সম্পর্কিত বিষয় এবং অন্যান্য ঘটনা ভাগাভাগি করার সুযোগ করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এগুলোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছেন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করার সময়ও তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করতে দেখা যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে ও সহজলভ্যতার ব্যাপকতায় আজকালকার সমাজে প্রায় তরুণ-তরুণীর হাতেই রয়েছে রকমারি মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ প্রভৃতি। ফেসবুক এক অর্থে সমাজের দর্পণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সমাজে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক চিন্তার মানুষ যে বেশি এটি ফেসবুকের বদৌলতে আরও স্পষ্ট হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত উত্থান এক কল্পিত জগৎ তৈরি করেছে। ছবি, শব্দ, লেখার সাহায্যে সামাজিক মাধ্যমে যে জগৎ তৈরি হচ্ছে সেটি কৃত্রিম। এটি গ্রাস করে নিচ্ছে বাস্তবজগৎকে। আজকের পৃথিবীতে নেট আসক্তিকে তুলনা করা হচ্ছে জীবনগ্রাসী মাদকাসক্তির সঙ্গে। বিশ^ জুড়ে বাঘা বাঘা প্রযুক্তি বিশ্লেষকগণ প্রযুক্তি আসক্তির অশনিসঙ্কেত দিচ্ছেন জোরালোভাবে। কিন্তু কে শুনে কার কথা! রঙিন চশমা পরে প্রত্যেকেই আনন্দে আটখানা। দারুণ সুকৌশলে সোশ্যাল মিডিয়াগুলো তরুণ-তরুণীদের মগজধোলাই করে তাদের সবটুকু মনোযোগ কেড়ে নিয়ে নিবদ্ধ করছে প্রতিদিনকার পোস্ট, লাইক, শেয়ার আর কমেন্টে। যেন জীবনের গণ্ডি আঙুলের ছাপের কিছু লাইক, শেয়ার আর কমেন্ট সেকশনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এই সোশ্যাল মিডিয়াগুলো তরুণ সমাজের যেমন উপকার করছে, তেমনি তাদের নিজেদের অজান্তে তাদের ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে। শিক্ষাগ্রহণের এই বয়সে সারাক্ষণ ফেসবুকের নেশায় বুদ হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে নতুন প্রজন্ম। ক্ষুধামন্দা, মানসিক বৈকল্য, বিষণ্নতা ও শারীরিক অক্ষমতা তৈরি হচ্ছে তাদের মধ্যে। ফলে কোমলমতি এসব ছেলেমেয়ের মনোযোগ কমে যাচ্ছে পাঠাভ্যাসে, সেই সঙ্গে সামাজিক সৌজন্যতাবোধও। খিটখিটে মেজাজ, হিংস্রতা, চোখের অসুখ, নার্ভের সমস্যা দেখা দিচ্ছে তাদের। মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ফেসবুকচারী এই প্রজন্ম। সবকিছু মিলিয়ে নেতৃত্ব ক্ষমতাহীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং বাস্তবতার বাইরে তৈরি হচ্ছে এক অলীক স্বপ্নময় জীবন (ভার্চুয়াল লাইফ)। যার নেশায় আসক্ত নতুন প্রজন্ম। আর এই আসক্তির ফলে যা ঘটে তা আরও ভয়াবহ। যেমন- আবেগ-অনুভূতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, হতাশা ও দুশ্চিন্তা পেয়ে বসে, একাকী বোধ হয় ও নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করে আসক্ত ব্যক্তি, কাজের সময় ঠিকঠাক থাকে না, কাজের আগ্রহ হারিয়ে যায়, সময়জ্ঞান লোপ পায়, অসৎ পথে পরিচালিত হতে বাধ্য হয়, নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে ঈর্ষাবোধ হতে শুরু করে, দায়-দায়িত্ব ভুলে মনোযোগ ডুবে থাকে ফেসবুকে এবং সম্পর্ক নষ্ট হয়, এমনকি ঘর ভেঙে যেতে পারে। এ ছাড়াও নানাবিধ শারীরিক সমস্যা- পিঠব্যথা, মাথাব্যথা, স্পন্ডাইলিটিজ বা মেরুদণ্ডে সমস্যা, ওজনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে কারও ওজন বেড়ে যায় আবার কারও ওজন কমে যায়, ঘুমের ব্যাঘাত ও চোখে সমস্যা হয়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে খ্যাত ওয়েবসাইটগুলো দেশের তরুণ সমাজকে অন্ধকারের দিকেই ধাবিত করছে। অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কিশোর, তরুণ ও যুব সমাজের বড় একটি অংশ আশঙ্কাজনকভাবে জড়িয়ে পড়ছে নানা সাইবার ক্রাইমে। সাইবার ক্রাইম থেকে পরবর্তীতে ঘটছে নানা ধরনের বড় বড় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

অনেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট করতে হলে নির্দিষ্ট বয়সের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই নিয়মকে সম্মান করতে হবে, নির্দিষ্ট একটি বয়স না হলে, এই ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট করা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের অভিভাবকগণ প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতে পারেন। অনেক সময় ব্যবহারকারীরা শিশুদের বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে থাকেন যা ঠিক নয়। ডিজিটাল প্রযুক্তি বিপ্লবের এই যুগে তরুণ-তরুণীদের সিংহভাগই তাদের নিজেদের হারিয়ে ফেলছে ডিজিটাল ডিভাইসের কুয়াশার ভিড়ে। প্রতিদিন তিনবারের বেশি এগুলো ব্যবহার করলে ‘ঘনঘন ব্যবহার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মেয়েদের মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কটের ৬০ শতাংশই খারাপ মানের ঘুম এবং সাইবার উত্ত্যক্তের জন্য দায়ী। এক্ষেত্রে ব্যায়াম বা শারীরিক ক্রিয়াকলাপ হ্রাস কম ভূমিকা পালন করে। তবে ছেলেদের ক্ষেত্রে ঘনঘন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের প্রভাবগুলো কেবল ২০-৩০ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। ঘনঘন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ফলে বয়ঃসন্ধিকালে হতাশাজনক লক্ষণগুলো পরিলক্ষিত হয়। সমস্যাগুলো সরাসরি সামাজিক মাধ্যমগুলো সৃষ্টি করছে না, বরং এগুলো স্বাস্থ্যকর ঘুম ও ব্যায়ামের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে পরিবারের ভেতরেও নানা রকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। কিশোর-কিশোরীদের বাবা-মায়েরা ভীষণ সংগ্রাম করছেন তাদের সন্তানকে এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে রাখার জন্য। কারণ রাতের পর রাত জেগে বাচ্চারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকছে, পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। তারা বুঝতে পারছেন না কীভাবে সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রেখে সহায়তা করবেন। অনেকে রাত জেগে মোবাইলে ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যস্ত থাকছে যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা। সহজেই একজনের সঙ্গে আরেকজনের যোগাযোগ হচ্ছে। একারণে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, একাধিক সম্পর্ক- এসবও বেড়ে যাচ্ছে। ড্রাগের আসক্তির চেয়েও সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে এ আসক্তি। 

করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য চালু করা হয়েছিল অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল যেন এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সচল রাখা যায়। এ লক্ষ্যে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানের হাতে তুলে দেন মোবাইল ফোন।

অনেক সময় শিশু-কিশোরদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানের সামাজিক মিডিয়ার কার্যকলাপ চেক করতে পারেন, যাতে করে তাদের সন্তানকে সামাজিক ও নৈতিকতা বোধ শিক্ষা দেওয়া যায়। যার ফলে শিশু-কিশোররা বুঝতে পারবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়। অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে বোঝাতে হবে যেন সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার না করে, কীভাবে কঠিন পাসওয়ার্ড তৈরি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা ও কঠিন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করা। অপরিচিত কারও বন্ধুত্ব গ্রহণ না করা। ব্যক্তিগত তথ্য যেমন- জন্মতারিখ, ফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা, লোকেশন না দেওয়া। শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের এই বিষয়টি অবশ্যই বোঝাতে হবে যে, প্রোফাইল থেকে যাতে গ্রহণযোগ্য এবং সম্মানজনক পোস্ট দেওয়া হয় বা শেয়ার করা হয়। পোস্ট বা শেয়ার যাতে সবার জন্য উন্মুক্ত না থাকে সেই দিকে খেয়াল রাখা। ব্যবহারকারীকে লক্ষ রাখতে হবে যেন অপরিচিত সোর্স হতে কোনো লিঙ্কে যেন ক্লিক না পড়ে, পাইরেট সফটওয়্যার বা অ্যাপ ব্যবহার না করা, সব সময় সক্রিয় ও হালনাগাদ অ্যান্টিভাইরাস সিকিউরিটি স্যুট ব্যবহার করা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার সম্পর্কে যথাযথ শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অভিভাবকদেরও সচেতন থাকা দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্যারেন্টিং কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
 

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


আরও সংবাদ   বিষয়:  তরুণদের ফেসবুক আশক্তি   করোনাকালীন সংকট  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]