ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১ ৩ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

কানে হেডফোন, ট্রেনে কাটা পড়ে ২ বছরে ১১৬ মৃত্যু
আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২১, ৯:৩৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 110

ময়মনসিংহ শহরের কাশর এলাকায় রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া এক কিশোরের। একইভাবে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে মৃত্যু হয়েছে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের। পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার কৈডাঙ্গা গ্রামে রেল সেতুর পূর্ব পাড়ে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন মানসিক ভারসাম্যহীন এক বৃদ্ধ। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রেললাইনে বসে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনার সময় কাটা পড়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এমন একটি বা দুটি নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে বিভিন্ন বয়সের মানুষ।

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে সারা দেশে ট্রেনে কাটা পড়ে ও দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ৯ হাজার ১০টি। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে অসতর্কতা এবং কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনে চলাচল ও পার হওয়ার কারণে। গত দুই বছরে কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনে যাতায়াতের সময় মৃত্যু হয়েছে ১১৬ জনের। একই কারণে গত বছরই মারা গেছে ৭৯ জন। এ ছাড়া গত ৫ বছরে রেললাইনে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১০২টি। ট্রেনে কাটা পড়ে ও দুর্ঘটনায় ১৯ বছর থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত মানুষের মৃত্যুর হার সব থেকে বেশি। রেলওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে কর্মকর্তা ও দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানত অসতর্কতা ও বেপরোয়াভাবে রেললাইন পারাপারের কারণে বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টরা এসব মৃত্যুর জন্য প্রায় ১০টির মতো কারণ চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, ৮০ শতাংশ মৃত্যুই অসতর্কতার কারণে ঘটে। এ ছাড়া বাঁকা পথের কারণে ট্রেন দেখতে না পাওয়া, রেললাইন ধরে অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটা, আশপাশের প্রচণ্ড শব্দে ট্রেনের শব্দ শুনতে না পাওয়া, লাইনের দুপাশে দোকান-বাজার বা অবৈধ স্থাপনা, অননুমোদিত ক্রসিং, সিগন্যালে দায়িত্বরত লোক না থাকা, মানসিক ভারসাম্যহীন বা মাদকসেবীদের বেসামাল চলাচল ও দ্রুত ট্রেন থেকে নামাও রেললাইনে মৃত্যুর কারণ।

রেলওয়ে পুলিশ বলছে, ব্রিটিশ শাসনামলের ১৮৬১ সালের পুরনো আইনে চলছে রেল। এ আইনের ১২ নম্বর ধারায় বলা আছে, রেললাইনের দুপাশে ২০ ফুটের মধ্যে নির্দিষ্ট লোক ছাড়া কেউ এমনকি গবাদিপশু প্রবেশও নিষিদ্ধ। ট্রেন দুর্ঘটনা ছাড়া লেভেল ক্রসিং বা লাইনে কাটা পড়ে মৃত্যুর জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দায়ীর বদলে উল্টো মামলা করার নিয়ম রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে রেললাইনে ২৫টি দুর্ঘটনাপ্রবণ পয়েন্ট রয়েছে। রাজধানীর ভেতরে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা ৩টি ও বাইরে ২২টি। ভেতরের তিনটি হলো ধীরাশ্রম, বিমানবন্দর ও খিলগাঁও। পুরনো আইনের সংস্কার, অরক্ষিত ক্রসিংয়ে জনবল নিয়োগ ও বৃদ্ধিসহ সচেতনতা বাড়ানো গেলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বহুগুণে কমবে। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর তথা রেলওয়ে ও এলজিআরডি, সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।

দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত রেললাইনে কাটা পড়ে মারা গেছে ৪১৭ জন। এ ছাড়া ২০১১ সালে ৮৮৪ (পুরুষ ৬৯৬ ও নারী ১৮৮), ২০১২ সালে ১ হাজার ২৩ (পুরুষ ৮০০ ও নারী ২২৩), ২০১৩ সালে ৯৪০ (পুরুষ ৭৩৮ ও নারী ২০২), ২০১৪ সালে ৯৬৭ (পুরুষ ৭৪২ ও নারী ২২৫), ২০১৫ সালে ৮৭০ (পুরুষ ৬৬৬ ও নারী ২০৪), ২০১৬ সালে ৭২৮ (পুরুষ ৫৬৭ ও নারী ১৬১), ২০১৭ সালে ১০২৬ (পুরুষ ৭৯২ ও নারী ২৩৪), ২০১৮ সালে ১ হাজার ২ (পুরুষ ৭৭৪ ও নারী ২২৮), ২০১৯ সালে ৯৮০ (পুরুষ ৭৩১ ও নারী ২৪৯), ২০২০ সালে ৭১৩ (পুরুষ ৫৫২ ও নারী ১৬১ জন)। এ ছাড়া এ বছরের জানুয়ারিতে ৮৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬৭, মার্চে ৮২, এপ্রিলে ১৮, মে মাসে ২৮, জুনে ৪৭, জুলাইয়ে ২৫ ও আগস্টে ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে গত ১০ বছরে মৃত্যুর ঘটনায় মোট ৯ হাজার ১০টি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৪১৭টি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপমৃত্যুর মামলা হলেও কখনও হত্যার ঘটনাও ঘটে। গত ৫ বছরে রেললাইনে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১০২টি। আর এ বছর আগস্ট মাস পর্যন্ত ৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অপমৃত্যু মামলা ছাড়া ২০১৬ সালে নিয়মিত মামলা হয়েছে ৮২০টি। ২০১৭ সালে ৯২২টি, ২০১৮ সালে ৯৭৪টি, ২০১৯ সালে ৭৫৪টি, ২০২০ সালে ৪৩৬টি। চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত মামলা হয় ২৬১টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৪১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৩টি, মার্চে ৫০, এপ্রিলে ২০, মে মাসে ১৩, জুনে ৩২, জুলাইয়ে ১৩ এবং আগস্টে ৩৯টি নিয়মিত মামলা হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অসতর্কতা বা কানে হেডফোন লাগিয়ে চলাচলের কারণে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালে হেডফোনের কারণে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২০ সালে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯ জনে। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ট্রেনলাইনে বসা ও চলাচলের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩৬৬ জনের। বাকিরা অন্যান্য কারণে। অন্যদিকে ২০২০ সালে ট্রেনলাইনে বসা ও চলাচলের কারণে মৃত্যু হয়েছে ২২৮ জনের। বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে ০-১৮ পর্যন্ত বয়সের মারা গেছে ৭০ জন, ১৯-৫০ পর্যন্ত ৬৫৮ জন ও ৫০-এর ওপরে ২৫২ জন। আবার ২০২০ সালে মৃতদের মধ্যে ০-১৮ বছর বয়সি ৪০ জন, ১৯-৫০ বছর বয়সি ৪৭১ জন ও ৫০-এর ওপরে ছিল ২০২ জন।

রেলওয়ে পুলিশ বলছে, সারা দেশে অনুমোদিত রেলক্রসিং রয়েছে ১ হাজার ৩৫৫টি আর অননুমোদিত ক্রসিং ৫৫৫টি। এ ছাড়া ক্রসিংয়ে গেটম্যান আছে ১ হাজার ৮টিতে। তবে রেলওয়ের মতে, এ সংখ্যাটা প্রায় সাতশর মতো। রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, রাজধানীতে সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তা তৈরির কারণে কিছু অবৈধ ক্রসিংয়ের সৃষ্টি হয়েছে। রেলের তালিকায় এসব ক্রসিং না থাকায় জনবল নিয়োগ করা যায়নি। এসব ক্রসিংকে বৈধতা দেওয়াসহ গেটম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান।

রেলওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, রাস্তার মধ্যে রেললাইন নেওয়ার জন্য রেলওয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। অনেক সময় এমনটা হয় না। প্রতিটি ক্রসিংয়ে স্বাভাবিকভাবে চারজন ও ন্যূনতম তিনজন লোক দরকার। রেলওয়ে নিজস্ব অর্থে গেটম্যানদের ব্যয় বহন করে। ব্যয় বাড়ার কারণে তারা লোক নিয়োগ দিতে চায় না। আবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও খরচ বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে লোক নিয়োগ দিতে চায় না। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দোটানার কারণে দীর্ঘ দিনেও বিষয়টির নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বর্তমানে অরক্ষিত ক্রসিং বা সিগন্যালগুলোতে লোক নিয়োগ দিলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হবে। এতে দুর্ঘটনা ও মৃতের সংখ্যা উভয়ই কমবে।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি মো. শাহ আলম সময়ের আলোকে বলেন, দেশের উন্নতির স্বার্থেই ছোট-বড় অনেক রাস্তা নির্মাণ করা হয়। আবার প্রয়োজনে রেললাইনের ওপর দিয়ে এসব রাস্তা নেওয়া হয়। ব্যয়বহুল হওয়ায় নতুন হওয়া এসব জায়গায় ওভারপাস বা আন্ডারপাস করা সম্ভব নয়। এ কারণে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়াই সঠিক ও যথাযথ সমাধান। তার মতে, প্রতিবছর দুর্ঘটনায় অনেক অমূল্য জীবন ঝরে যায়। সে বিবেচনায় লোক নিয়োগের ব্যয়ের তুলনা অযৌক্তিক। তবে দুর্ঘটনা রোধ ও পথচারীদের সতর্ক করতে পুলিশ নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে সভা-সমাবেশ, মাইকিং করা, লিফলেট বিলি, ব্যানার টাঙানো, রেললাইনের দুপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও রেললাইনের পাশ ঘেঁষে রিকশা বা ছোট যানবাহনের অবৈধ চলাচল বন্ধসহ নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়।

সংস্থার বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রেলওয়ে ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ক্রসিংয়ে লোক নিয়োগসহ অন্যান্য সমস্যার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা উচ্চ পর্যায় থেকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বিষয়টির সমাধান করলে বা লোক নিয়োগ দিতে বললে স্থায়ী সমাধান হবে।

রেললাইনে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ডিআইজি বলেন, সাধারণত যে মৃতদেহগুলো শনাক্ত করা যায় সেগুলোকে তাদের অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে যাদের শনাক্ত করা যায় না সেসব মৃতদেহ বিভিন্ন কৌশলে শনাক্ত করা হয়। পরিচয় নিশ্চিত হলে পরিবার বা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থা সিআইডি ও পিবিআইয়ের সহযোগিতা নেওয়া হয়। তবে দ্রুততম সময়ে মৃতদেহ শনাক্তের জন্য প্রতিটি রেলওয়ে থানায় ক্রাইমসিন ইউনিট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে কাজ শুরু হবে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ সময়ের আলোকে বলেন, ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুতে চলাচলকারীদের দায় বেশি। ট্রেন একটি নিরবচ্ছিন্ন বাহন হওয়ায় তাৎক্ষণিক থামানোর সুযোগ নেই। কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইন পার হওয়া, চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নেমে পড়া, অসতর্ক অবস্থায় পারাপারসহ বিভিন্ন কারণে দুর্ঘনা ঘটে। এ ছাড়া রেলক্রসিংগুলোতে রাস্তা ভাঙা থাকায় হঠাৎ যানবাহনের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষেরও উদাসীনতা রয়েছে। তার মতে, রেললাইনের দুধারে গাছপালা ও বাজার থাকায় অতিরিক্ত শব্দ ও আলোর কারণে রেলের সাউন্ড বা বাতি পার্থক্য করা যায় না। এক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব।


আরও সংবাদ   বিষয়:  ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু     




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]