ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১ ৩ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

কিডনি বিক্রি করতে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে শতাধিক মানুষ পাচার
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২১, ১০:৪৮ এএম আপডেট: ১৩.১০.২০২১ ১০:৫২ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 4945

প্রতিটি কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য দিশেহারা রোগী-স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া হতো ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে কিডনিদাতাকে (ডোনার) ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করা হতো। আস্থা সৃষ্টির জন্য অগ্রিম দেওয়া হতো মাত্র ২ লাখ টাকা। কিন্তু কিডনি প্রতিস্থাপন (ট্রান্সপ্লানটেশন) সম্পন্ন হলে দরিদ্র সেই ডোনারকে প্রতিশ্রুতির সেই টাকা না দিয়ে উল্টো হুমকি-ধমকি দেওয়া হতো। এখানেই শেষ নয়, টার্গেট ব্যক্তিকে পাশ্ববর্তী দেশে নেওয়ার পর কোনো কারণে রোগীর সঙ্গে কিডনি ম্যাচিং না হলে তখন পাচার করা বা ডোনার ব্যক্তির ৭০ শতাংশ লিভার কেটে রাখা হতো!

ভয়াবহ রকমের এই অবৈধ কিডনি কেনাবেচার সংঘবদ্ধ চক্রের হোতা শাহরিয়ার ইমরান আহমেদসহ পাঁচজনকে সোমবার গভীর রাতে গ্রেফতার করেছে এলিট ফোর্স র‌্যাব। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানিয়ে আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশ কিডনি ও লিভার পেশেন্ট চিকিৎসাসেবা’ এবং ‘কিডনি-লিভার চিকিৎসাসেবা’- নামে ফেসবুকে দুটি পেজ খুলে সেখানে বিজ্ঞাপন দিয়ে কিডনি কেনাবেচা করে যাচ্ছিল প্রতারক চক্রটি। ফেসবুকে এ দুটি পেজের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিডনি কেনাবেচার জন্য ইতোমধ্যেই সংঘবদ্ধ এই চক্র শতাধিক মানুষকে পাশ্ববর্তী দেশে পাচার করেছে।

কমান্ডার মঈন বলেন, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত র‌্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-২ এবং র‌্যাব-৫ ব্যাটালিয়নের যৌথ অভিযানে রাজধানীর নর্দা এলাকা ও জয়পুরহাট জেলা থেকে অবৈধ কিডনি কেনাবেচা চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো- চক্রের হোতা মো. শাহরিয়ার ইমরান আহম্মেদ (৩৬), মো. মেহেদী হাসান (২৪), মো. সাইফুল ইসলাম (২৮), মো. আবদুল মান্নান (৪৫) ও মো. তাজুল ইসলাম ওরফে তাজু (৩৮)। অভিযানকালে ভুক্তভোগী কিডনিদাতাদের চারটি পাসপোর্ট, মেডিকেল চিকিৎসার জন্য পাসপোর্ট, ভিসা সম্পর্কিত বেশকিছু কাগজপত্র, পাঁচটি মোবাইল ও দেশি-বিদেশি মুদ্রা জব্দ করা হয়েছে।

কিডনি কেনাবেচা ও প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ায় সংঘবদ্ধ এই চক্রের কৌশল সম্পর্কে র‌্যাবের পরিচালক বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন। তারা মূলত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে কিডনি কেনাবেচার কাজ করে থাকে। প্রথম গ্রুপ ঢাকায় অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজন এমন বিত্তশালী রোগীদের টার্গেট করে যোগাযোগ করে। দ্বিতীয় গ্রুপটি প্রথম গ্রুপের চাহিদা মোতাবেক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র সহজ-সরল মানুষদের চিহ্নিত করে তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে টাকার বিনিময়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য ডোনার হিসেবে ঢাকায় নিয়ে আসে।

পরবর্তী সময়ে তৃতীয় গ্রুপ ঢাকায় বিভিন্ন ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে কিডনি প্রতিস্থাপনের রোগীর সঙ্গে মেডিকেল ম্যাচিং এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে। এসব প্রক্রিয়ায় উপযোগিতা নিশ্চিত হলে তার পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেসিং এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে ভুক্তভোগী ডোনারকে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করে তারা। এই চক্রের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশে অবস্থানকারী আরেকটি চক্র পারস্পরিক যোগসাজশে কিডনি ডোনারকে বিদেশে নিয়ে যাওয়াসহ সেখানকার যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করে ভিকটিমকে আবার দেশে ফেরত পাঠায়।

র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, প্রতারক শাহরিয়ার ইমরান এই চক্রের হোতা। সে ফেসবুকে ‘বাংলাদেশ কিডনি ও লিভার পেশেন্ট চিকিৎসাসেবা’ এবং ‘কিডনি-লিভার চিকিৎসাসেবা’ নামে দুটি পেজে বিজ্ঞাপন দিয়ে কিডনি কেনাবেচার জন্য সংঘবদ্ধভাবে শতাধিক মানুষকে পার্র্শ^বর্তী দেশে পাচার করেছে। চক্রটি এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।

কমান্ডার মঈন বলেন, জয়পুরহাট থেকে গ্রেফতার আবদুল মান্নান এর আগেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়। তার বিরুদ্ধে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনে ৬টির বেশি মামলা রয়েছে। মান্নান প্রায় দশ বছর ধরে এই অপকর্মে জড়িত। এ ছাড়া তাজুলের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেফতার দুই আসামি সাইফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান কিডনি ডোনারদের পাশ্ববর্তী দেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট, মেডিকেল ভিসা এবং আত্মীয়জস্বন সম্পর্কে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও অন্যান্য জালিয়াতির কাজগুলো করত। এ ছাড়া আইনের হাত থেকে বাঁচার জন্য চক্রটি কোনো প্রকার রিসিট, পাসপোর্ট বা অন্যান্য প্রমাণ ডোনারকে সরবরাহ করত না। চক্রের মূল হোতা ইমরান ভারতে অবস্থান করে স্থানীয় দালাল ও অনলাইনের মাধ্যমে কিডনি রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করত।

কিডনি কেনাবেচা চক্রের সদস্যদের সঙ্গে দেশীয় কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক জড়িত কি না, এমন প্রশ্নে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, দেশের হাসপাতালের তথ্য আমরা পাইনি। তবে তারা কোন হাসপাতাল-ক্লিনিকে কিডনি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া করত সে বিষয়ে জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একমাত্র নিকটজন ব্যতীত মানবশরীরের কিডনি ট্রান্সপ্লানটেশন  আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু তারপরও থেমে নেই অবৈধ কিডনি ট্রান্সপ্লানটেশন। সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র মোটা অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে দরিদ্র সহজ-সরল মানুষদের কিডনি দেওয়ার জন্য পাচার করছে পাশ্ববর্তী দেশে। এর আগে ২০১১ সালেও জয়পুরহাটের কালাই উপজেলাসহ উত্তরাঞ্চলকেন্দ্রিক একাধিক চক্র দরিদ্র সহজ-সরল বিপুলসংখ্যক মানুষকে নানা কৌশলে কিডনি বিক্রি করিয়ে ছিল। ওই সময়ে চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভয়াবহ এই অপতৎপরতা আবারও শুরু হয়েছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]