ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ৫ ডিসেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

আক্ষেপ
সনোজ কুণ্ডু
প্রকাশ: শুক্রবার, ১ অক্টোবর, ২০২১, ৭:৩৫ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 308

কোনো এক কার্তিকের বিকালে বিবর্ণ সূর্যটা আড়াআড়ি ঝুঁকে ছিল মৃত হালিমার কপালে। ধলা মাঝি তার পা ধরে শেষবারের মতো ক্ষমা চেয়েছিল-

‘আমারে তুই মাপ কইরা দিস বউ, আমি তোরে শান্তি দিবার পারি নাই।’ অভাবের কাছে পরাজিত হয়ে কিংবা স্বামীর ওপর অভিমান করে হালিমা সেদিন এন্ড্রিন খেয়ে আত্মহত্যা করে। ধলা মাঝির দুঃখের অংশীদার হতে তার ঘরে আসে জায়েদা বেগম। অভাবকে সে সঙ্গী করেই বড় হয়েছে। স্বামীর নতুন অভাব তাকে টলাতে পারে না। শিউলি হালিমার মেয়ে। প্রতিবন্ধী হওয়ার অপরাধে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে দীর্ঘদিন বাপের বাড়ি পড়ে আছে। তবে সতীনের মেয়ে হলেও জায়েদা কখনই শিউলিকে অবহেলা করে না। জায়েদার ভালোবাসা দেখে কারও মনেই হবে না সে শিউলিকে পেটে ধরেনি। তাই তো ধলা মাঝি নিশ্চিন্তে দিনের পর দিন ইলিশ ধরতে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারে।

ধলা মাঝি ঘরের বারান্দায় বসে ফুঁক ফুঁক করে হুক্কা টানছে আর হালিমার কথা ভাবছে। সে মরে হয়তো বেঁচে গেছে কিন্তু ধলা তাকে আজো ভুলতে পারেনি। হুক্কার গোল ধোঁয়া তার মাথার ওপর চক্কর খায়। সেই কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায় দেখতে পায় হালিমার বেদনাপূর্ণ মুখ। জায়েদা সামনে দাঁড়িয়ে ধলা মাঝির ধ্যান ভাঙায়।

‘কী হইলো মিঞা, কইলক্যার তামাক তো শ্যাষ হইয়া গেছে। আপনি তো আগুনধোয়া পানি গিলতাছেন।’ ধলা বউকে কাছে ডেকে বলে- ‘পদ্মায় নাকি ম্যালা ইলিশ ধরা পড়তাছে। আমারে আজই যাইতে হবে। তুমি শিউলির ওপর খেয়াল রাইহো।’

‘তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি আইসো। শিউলির শরীরহান ভারি নরম হইছে। আর শোনো, মাইয়াডা বড় ইলিশের পাতুরি খাবার চাইছে। তুমি আনবা কইলাম। পোয়াতি মাইয়াগো সাধ অপূর্ণ রাখতি নাই।’ জায়েদা সোয়ামিকে বলে।

দুই
তখন কুবের মাঝিদের নৌকায় ইঞ্জিন ছিল কি না বশিরের জানা নেই। তবে তার দুই জোড়া নৌকায় ইঞ্জিন বসেছে। এ নিয়ে সে অন্য জেলেদের সামনে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। মহাজনের কাছে বশির উদ্দিনের ভারি কদর। তার জালেই বেশি পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। তা ছাড়া ধলা, গোকুল, উপেন, ফেলুদের মতো অভিজ্ঞ মাঝিদের সে দলে নিয়েছে। ইলিশ মাছ ধরার কৌশল ধলা মাঝির চেয়ে কেউ ভালো জানে না। গভীর সমুদ্রে ইলিশ ধরার অভিজ্ঞতা তার আছে। যত তীব্র স্রোত কিংবা ঢেউ থাকুক না কেন, ধলা মাঝি ঢেউয়ের তালে তালে জাল ফেলতে ভীষণ পটু।

আজ ভরা পূর্ণিমা বলেই ইলিশ ধরা পড়ছে বেশি। বশির উদ্দিনের মনে অন্যরকম আনন্দ। যত বেশি ইলিশ, তত বেশি টাকা। পূর্ণিমা রাত এলেই সে ধলাদের নৌকায় রাত জাগে বসে থাকে। ধলা জাল থেকে ঘপাঘপ ইলিশ খসিয়ে নৌকার খোল ভরছে। তখনি বিশাল আকৃতির একটি ইলিশ ধলার হাতে ধরা পড়ে। জ্যোৎস্নার আলোটাও যেন ইলিশের শরীর চেটে খেতে চায়। ইলিশের আঁশগুলো রুপোর মতো চকচক করছে। ধলা মনের আনন্দে ইলিশের শরীরে হাত বুলায়। এত বড় ইলিশ অনেক দিন ধরা পড়ে না। মুহূর্তেই শিউলির কথা মনে পড়ে। এত বড় ইলিশ দেখলে মেয়েটা বড় খুশি হবে। কিন্তু বশির উদ্দিনের দৃষ্টি চিলের মতোই। ধলার হাত থেকে ইলিশটা ছোঁ মেরে নিয়ে যায়।

‘ওরে বাবা, এত বড় ইলিশ। দুই কেজির কাছাকাছি হইবোরে। মহাজন ভারি খুশি হইবো। আগেই কইয়া রাখছে বিদেশ থেইক্যা তার মাইয়া জামাই আইছে।’
হা-পিত্যেশে ভরে যায় ধলার বুক- ‘ইলিশটা আমারে দাও বশির ভাই, আমার মা মরা পোয়াতি মাইয়াডা বড় ইলিশের পাতুরি খাবার চাইছে।’ ধলা হতাশ গলায় বলে।
‘আরে না, পরে দেওন যাইবো। তুই মাছ ধর আগে।’

ধলার আনন্দ কেমন খাঁ খাঁ শূন্যতায় তলিয়ে যায়। প্রবল বাতাসের মুখে হাতের তালু গোল করে ফস করে ম্যাচকাঠিতে আগুন জ্বালিয়ে বিড়ি ধরায়।

তিন
ভোররাত থেকেই মাওয়াঘাট আড়তের সামনে জেলেদের ভিড়। চারদিকে থরে থরে ইলিশের ডালি সাজানো। সবার আগে আড়তের সামনে হাজির হয় বশির উদ্দিন। হাতে তার সেই ইলিশ ঝুলছে। উপস্থিত সব জেলের দৃষ্টি ইলিশের দিকেই। মহাজন আয়নাল খাঁ গদিতে বসে পান চিবুচ্ছে। বশির উদ্দিনের হাতে এত বড় ইলিশ দেখে তার চোখ যেন ছানাবড়া। ‘আমার জন্যি আনছোতো বশিরউদ্দিন! ভালোই করছো, সৌদি থেকে মাইয়া জামাই আইছে। বড় ইলিশ খাইতে চাইছে। তুমি আমার ইজ্জত বাঁচাইছো। তোমারে বকশিশ দেওনের কাম।’ খুশিতে গদগদ হয়ে সে ইলিশের পেটে চুমু খায়। ‘আহারে! ইলিশের কী বাসনা! কেবল বড় ইলিশেই এই বাসনা বাতাসে ঘুইড়া বেড়ায়।’
ধলা মাঝি ভয়ে জড়সড়। সে সাহস করে মহাজনের গদির কাছে দাঁড়ায়। কিন্তু কিছুই বলার সাহস পেল না।

আজ বাতাসের প্রবল বেগ। নদীও উত্তাল। ছোট ডিঙিগুলো আগেই নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। আজো সন্ধ্যারাত থেকে ইলিশ ধরার হিড়িক পড়েছে। কাকতালীয়ভাবে ধলাদের জালে ধরা পড়ে একডজন ছোট ইলিশের সঙ্গে একটি বড় সাইজের ইলিশ। আজ ধলা এই ইলিশটা হাতছাড়া করবে না। মনের ফুর্তিতে সে চাঁদের দিকে তাকায়। ওই চাঁদের ভেতর শিউলি যেন মিট মিট করে হাসছে। বদমাশ বশির উদ্দিন এতক্ষণ নাক ডেকে ঘুমুচ্ছিল। বড় ইলিশটা ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে জেগে ওঠে। টর্চের একফালি তির্যক আলো ঠিকরে পড়ে ধলার হাতে ধরে রাখা ইলিশটার দিকে। বশির এক থাবা দিয়ে ইলিশটা কেড়ে নিয়ে নিজের কাছে রাখে-
‘কাইল আমার শালিকা বেড়াইতি আসবো। এই ইলিশ আমি বাড়ি নিয়া যাবো। আলাদা কইরা রাখো।’ ধলা মাঝির চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে প্রতিজ্ঞা করে বশির উদ্দিনের সঙ্গে আর কাজ করবে না। আজকের রাতই বশিরের নৌকায় মাছ ধরার শেষ রাত। ধলা দুঃখ ভুলতে আরেকটা বিড়ি ধরায়। গোপনে সে উপেন, গোকুলদের বলে রেখেছে বড় ইলিশ ধরা পড়লেই ওটা সরাতে হবে। ওই শয়তান বশির উদ্দিন সারাজীবন জেলেদের ঠকিয়েছে। ওকে একবার ঠকালে নিশ্চয়ই খোদা নারাজ হবেন না। এবার ভাগ্য যেন ধলা মাঝির সঙ্গেই ছিল। শেষ রাতের দিকে বশির যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখনই আরও একটি রিষ্টপুষ্ট বিশাল সাইজের ইলিশ ধরা পড়ে। আগের দুটো থেকে বড়। দুই কেজির বেশি হবে। উপেনের পরামর্শে ধলা মাজা থেকে গামছা খুলে ইলিশটা পেঁচিয়ে মাচালের অন্য প্রান্তে গুঁজে রাখে।

চার
কিন্তু বড়ই দুর্ভাগ্য ধলা মাঝির। চুরি করে এনেও মেয়েকে সে ইলিশ পাতুরি খাওয়াতে পারল না। আঙিনায় পা রাখতেই সাদা কাফনে মোড়া শিউলিকে দেখতে পায়। মেয়ের লাশ দেখে সে আর্তনাদ করে ওঠে। শেষ রাতেই শিউলি প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করে। অনভিজ্ঞ ধাত্রীর অসতর্কতার কারণে শিউলি মৃত সন্তান প্রসব করে মারা যায়।








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]