ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১ ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ৩০ নভেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

পদ্মা নদীর মাঝি : ইলিশ শিকার ও স্বপ্নবুনন
ফরিদ আহমদ দুলাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ১ অক্টোবর, ২০২১, ৭:২৬ এএম আপডেট: ০১.১০.২০২১ ৭:৩১ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 402

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৯টি উপন্যাসের মধ্যে সর্বাধিক পঠিত, আলোচিত ও জনপ্রিয় উপন্যাসটির নাম ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর উপন্যাসটি একাধিক বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়। বাংলা ভাষায় লিখিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার গৌরব ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র। ভারতের একাধিক প্রাদেশিক ভাষাসহ ইংরেজি, চেক, হাঙ্গেরিয়ান, রুশ, লিথুয়ানিয়ান, নরওয়েজিয়ান ও সুইডিশ ভাষায় উপন্যাসটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে বিস্তীর্ণ পদ্মাতীর সংলগ্ন ‘কেতুপুর’ ও পার্শ্ববর্তী কতিপয় গ্রামের জেলেদের জীবনচিত্র বর্ণিত হয়েছে এ উপন্যাসে নিপুণ মুন্সিয়ানায়। নগর জীবনের সামান্য ছিটেফোঁটাও নেই এ উপন্যাসে। হতদরিদ্র জেলেদের জীবন সংগ্রাম উপস্থাপিত হয়েছে পদ্মা নদীর মাঝিতে। গল্পের পটভূমি বিবেচনা করলে বলা যায়, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ একটি আঞ্চলিক উপন্যাস। অলঙ্কার শাস্ত্রের সংজ্ঞানুযায়ী এ উপন্যাসের আঙ্গিক, বুননশৈলী, চরিত্রের ভাষা, জীবনাচার, জীবনচর্চা সবই আঞ্চলিক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যে উপস্থাপিত। বিশিষ্ট সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ গ্রন্থে লিখেছেন- ‘... উপন্যাসটির সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ হইতেছে ইহা সম্পূর্ণরূপে নিম্নশ্রেণী অধ্যুষিত গ্রাম্য জীবনের চিত্রাঙ্কনে সূক্ষ্ম ও নিখুঁত পরিমিতিবোধ, ইহার সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যে সনাতন মানব প্রবৃত্তিগুলির ক্ষুদ্র সংঘাত ও মৃদু উচ্ছ্বাসের যথাযথ সীমা-নির্দেশ।’ পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের চরিত্র বিশ্লেষণের আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর নাম উচ্চারণ করে নিই- জননী, দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মা নদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, শহরতলী, চতুষ্কোণ, জীবন্ত, সোনার চেয়ে দামী, ইতিকথার পরের কথা ইত্যাদি। এ ছাড়া লেখেন ‘অতসী মামী’, ‘প্রাগৈতিহাসিক’, ‘মিহি ও মোটা কাহিনী’, ‘আজ কাল পরশুর গল্প’, ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’, ‘ফেরিওয়ালা’ ইত্যাদি গল্পগ্রন্থ।

পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে সঙ্গত কারণেই পাঠকের অনুসন্ধিৎসা থাকবে বাঙালির জীবনাচারে খাদ্য তালিকার অন্যতম আকর্ষণ ইলিশ; কারণ ইলিশের প্রসঙ্গ এলেই আসে পদ্মার ইলিশ। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের কৈবর্তপল্লীর মাঝিদের জীবিকার প্রধান উৎস ইলিশ শিকার। উপন্যাসে ইলিশ শিকারের প্রসঙ্গ অবশ্যই আছে; আছে ইলিশ শিকারের যন্ত্রণা, বিপণনের সঙ্কট, ইলিশের দাম নিয়ে মুৎসুদ্দি শ্রেণির প্রতারণা, মূল্যবোধের স্খলন কোনো কিছুই বাদ যায়নি উপন্যাসে; কিন্তু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের টানাপড়েন, শরীরী আকর্ষণ এবং নতুন করে বাঁচার আকাক্সক্ষাকে সাম্যবাদী জীবনাকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের হাতছানির কাছে পরাজিত হয়ে যায়। কাহিনির নায়ক, কুবের, যে পদ্মা নদীর দক্ষ মাঝি, যাকে আমরা দেখি প্রবল ঝড়েও লড়াই করে ফিরে আসতে; কুবেরের চিররুগ্ন প্রতিবন্ধী স্ত্রী মালা, যে তার তিন সন্তানের জননী; সেই স্ত্রী, সন্তান এবং সংসারের প্রতি কুবেরের দায়বদ্ধতার পাশাপাশি মালার ছোট বোন কপিলার প্রতি তাকে আকৃষ্ট হতে দেখি উপন্যাসে; এবং শেষ পর্যন্ত কুবের যখন স্বপ্নের আহ্বানে ময়নাদ্বীপে নতুন পৃথিবী গড়ার জন্য যাত্রা করে, তখন কপিলা তার সঙ্গী হয়ে যায়। উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র, যেমন- রাসু, শীতলবাবু, ধনঞ্জয়, পীতম মাঝি, গণেশ, আমিনুদ্দি এবং অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রের উপস্থিতিতে যে গল্প পল্লবিত হয়ে ওঠে, সবাইকে অলক্ষে নিয়ন্ত্রণ করে বিস্ময়কর চরিত্র হোসেন মিয়া। হোসেন মিয়া পদ্মাতীরের মানুষ নয়। বহিরাগত হয়েও হোসেন পদ্মাতীরের দরিদ্র মানুষকে সহযোগিতা করে, তাদের বিপর্যয়ে পাশে দাঁড়ায়। হোসেন মিয়াকে শুধু বিস্ময়কর চরিত্র বললেই হয় না; হোসেন মিয়া বরং এ উপন্যাসে অসংলগ্ন এক অতিমানবিক চরিত্র। ঔপন্যাসিকের স্বপ্নের চরিত্রও বলা যায় তাকে। উপন্যাসের চরিত্রগুলোর ঈর্ষা, বিদ্বেষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চক্রান্ত, সমবেদনা, দলাদলি, স্বার্থপরতা, প্রতিশোধ প্রবণতা এবং আবেগ, পদ্মা নদীর মাঝিদের ইলিশের সম্পৃক্ততাকে কখনও গৌণ করে তোলে; প্রধান হয়ে ওঠে হোসেন মিয়ার ময়নাদ্বীপের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। ইলিশ যেন পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের নেপথ্যচারী চরিত্র, সামান্য সময়ের জন্য দৃশ্যমান হয়েও সর্বত্র বিরাজমান। আমরা যদি লক্ষ করি, দেখবো, উপন্যাসটি শুরু হয়েছে ইলিশ ধরার বর্ণনা দিয়ে; একটু পড়ে নিই- ‘বর্ষার মাঝামাঝি। পদ্মার ইলিশ মাছ ধরার মরসুম চলিয়াছে। দিবারাত্রি কোনো সময়েই মাছ ধরবার কামাই নাই। সন্ধ্যার সময় জাহাজঘাটে দাঁড়াইলে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অনির্বাণ জোনাকির মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। জেলে-নৌকার আলো ওগুলি। সমস্ত রাত্রি আলোগুলি এমনিভাবে নদীবক্ষের রহস্যময় মøান অন্ধকারে দুর্বোধ্য সঙ্কেতের মতো সঞ্চালিত হয়। একসময় মাঝরাত্রি পার হইয়া যায়। শহরে, গ্রামে, রেল-স্টেশনে ও জাহাজঘাটে শ্রান্ত মানুষ চোখ বুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। শেষরাত্রে ভাঙা ভাঙা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদটি উঠে। জেলে-নৌকার আলোগুলি তখনো নেভে না। নৌকার খোল ভরিয়া জমিতে থাকে মৃত সাদা ইলিশ মাছ। লণ্ঠনের আলোয় মাছের আঁশ চকচক করে, মাছের নিষ্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মতো দেখায়। কুবের মাঝি আজ মাছ ধরিতেছিল দেবীগঞ্জের মাইল দেড়েক উজানে। নৌকায় আরও দু’জন লোক আছে, ধনঞ্জয় এবং গণেশ। তিন জনের বাড়িই কেতুপুর গ্রামে। আরও দু-মাইল উজানে পদ্মার ধারেই কেতুপুর গ্রাম।’

লেখকের পদ্মাতীরের কেতুপুরের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্তি না থাকলেও আপন মেধা ও মনীষার যোগ্যতায়, অনায়াসে হোসেন মিয়া হয়ে ওঠা; নিজের স্বপ্নকেই হোসেন মিয়ার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করিয়ে নেওয়া; এখানেই কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুশলতা।

সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শে দীক্ষিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে পদ্মাতীরের দরিদ্র মাঝিদের জীবনালেখ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি তার স্বপ্নের ‘ময়নাদ্বীপের’ কথা নিপুণভাবে তুলে এনেছেন এবং আমার বিশ্বাস স্বপ্নের ময়নাদ্বীপ দীর্ঘদিন ধরে বাংলার অনুসন্ধানী পাঠককেও স্বপ্নপ্রবণ করে তুলছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]