ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৪ অক্টোবর ২০২১ ৯ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ২৪ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

শিশুদের স্মার্টফোনে আসক্তি কমাবেন যেভাবে
রাফিয়া লাইজু
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৯:০৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 246

শিশুরা দেশের সম্পদ। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা মহামারি গভীরভাবে মানসিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করছে। এ সময়ে মোবাইলের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। আমরা অনেকেই বাচ্চাকে শান্ত রাখার জন্য তার হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব তুলে দেই। গান, কার্টুন বা মজার ভিডিও চালিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত রাখা হয়। আবার স্কুল, কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাসের কারণে বাধ্য হয়েই শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেই। দিনের সিংহভাগ সময় শিশুদের হাতে স্মার্টফোন থাকায় এক ধরনের আসক্তিতে রূপ নিয়েছে এটা! যে কারণে শিশুদের মধ্যে নানাবিধ বিরূপ মনোভাব তৈরি হচ্ছে, এমনকি অতি অল্প বয়সেই তারা অ্যাডাল্ট বিভিন্ন কনটেন্ট দ্বারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে! এভাবেই শিশুরা মোবাইলে অ্যাপসগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে যাচ্ছে এবং বিপজ্জনক সাইটেও ঢুকে পড়ছে!

ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন শিশু। আর প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজার অর্থাৎ প্রতি আধা সেকেন্ডে একজন শিশু নতুন করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে! ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ২৫ শতাংশের বয়সই ১০ বছরের কম এবং ফেসবুকসহ সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ার ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ থেকে ২৯ এর মধ্যে।

জার্নাল অব ইয়ুথ স্টাডিজ জানান, আমেরিকান শিশু-কিশোরদের ৯২ ভাগই প্রতিদিন অনলাইনে যায়। প্রতি পাঁচজনে একজন কিশোর গভীর রাতে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে শুধু এটা দেখার জন্য যে, তার মোবাইলে নতুন কোনো মেসেজ এসেছে কিনা। কানাডায় পূর্ণ বয়স্ক একজন সোশ্যাল মিডিয়ায় গড়ে দিনে দুই ঘণ্টা আর শিশু-কিশোররা সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় কাটায়। তার মানে আজ যে শিশুর বয়স ৮, সে তার জীবনের ১৫টি বছরই কাটিয়ে দেবে অন স্ক্রিনে। বাংলাদেশেও ইন্টারনেট প্রসারের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী, যার মধ্যে শিশুরাও আছে। বিটিআরসির ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে। যার বড় একটা অংশই যুক্ত থাকে নানা ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া সাইটের সঙ্গে।

কানাডার অ্যাসোসিয়েশন অব মেন্টাল হেলথের জরিপে উঠে এসেছে, ৭ থেকে ১২তম গ্রেডের যেসব শিক্ষার্থী দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটায়, তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি।

প্রযুক্তির নির্মাতারা পুরো বিশ্বে প্রযুক্তির প্রসার ঘটালেও তাদের নিজ সন্তানদের কিন্তু এ থেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখেছেন। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনকুবের বিল গেটসের সন্তানরা দিনে ৪৫ মিনিটের বেশি কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পায় না। শুধু তাই নয়, সন্তানদের বয়স ১৪ হওয়ার আগে স্মার্টফোন তো দূরের কথা, মোবাইল ফোনই কিনে দেননি তিনি।

আইফোন ও আইপ্যাডের মডেল বাজারে আসার আগেই অনলাইনে লাখ লাখ পিস অগ্রিম বিক্রি হয়ে যায়, তার নির্মাতা আ্যপলের কর্ণধার স্টিভ জবস; তার সন্তানদের আইপ্যাড ব্যবহার করতে দেননি। তিনি বলেন, সন্তানরা কতটা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে তার সীমারেখা তাদের বেঁধে দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তির হর্তাকর্তারা তাদের সন্তানদের কিন্তু ঠিকই প্রযুক্তির অগ্রাসী আসক্তি থেকে নিরাপদ রেখেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের ফলে বাধাগ্রস্ত হয় শিশুদের মানসিক বিকাশ। মোবাইল ফোনের বিকিরণ থেকে চোখের নানা রোগে আক্রান্ত হয় শিশুরা। স্মার্টফোন তথা ইন্টারনেট আসক্তি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়। একটু বড় হলে এ শিশুদের বেশিরভাগই মানুষের সঙ্গে মিশতে চাইবে না। বাইরে খেলাধুলার বদলে ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। আস্তে আস্তে একাকিত্ব পেয়ে বসবে তাদের। পরিবার থেকে একটু সচেতন থাকলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব। শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি কমাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন।

এক. দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিশুকে স্মার্ট ডিভাইসের সামনে থাকার অভ্যাস করুন। ওই সময়ের বাইরে স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখুন কোমলমতি শিশুকে। এ ছাড়া শিশু স্মার্টফোনে কী করছে বা কী দেখছে তার প্রতিও নজর রাখতে হবে।

দুই. শিশু যদি অনলাইনে ক্লাস করে, তাহলে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে সে কী করছে, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। এ ছাড়া স্মার্টফোন থেকে আপত্তিকর ওয়েবসাইটগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

তিন. প্রয়োজনে একসঙ্গে শিশুর সঙ্গে খেলুন বা ভিডিও দেখুন। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষণীয় ভিডিও শিশুর সঙ্গে বসে দেখতে পারেন। এতে সে একটু বড় হলে এসব ভিডিও দেখতে বেশি আগ্রহী হবে।

চার. প্রযুক্তির সুবিধা-অসুবিধা দুটোই সন্তানকে ভালো করে বুঝিয়ে বলুন। প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক আলোচনায় সঙ্গী হোন নিজ সন্তানের। অতিরিক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কী বিপদ হতে পারে, সেসব নিয়ে খোলামেলা কথা বলুন।

পাঁচ. অবসর সময়ে শিশুর সঙ্গে গল্প করুন। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই গল্প শুনতে এমনকি মাতৃগর্ভে থাকাকালে গল্প শুনলেও তার মানসিক বিকাশ বৃদ্ধি পায়। তাই শিশুকে বেশি সময় দিতে হবে এবং তার সঙ্গে প্রচুর গল্প করতে হবে।

ছয়. আপনার ঘরের পরিবেশটা কেমন? চারদিকে কী ডিভাইস? ঘরে ঢুকতেই একটা বড় টিভি? আপনিও কি এক মিনিট পরপর ডিভাইস দেখেন? তা হলে এগুলো পরিবর্তন করতে হবে। কারণ শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। তারা প্রথম শিক্ষা পায় পরিবার থেকে। তারা সেই শিক্ষাটাই গ্রহণ করবে যা নিজের সামনে দেখবে। তাই মা-বাবাকে এক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার, যতটা সম্ভব তার সামনে মোবাইল বা ডিভাইস পরিহার করুন।

সাত. ঘরের চারদিকে শিশুদের উপযোগী রঙ, তুলি, ছবি আঁকার জিনিস, কালার পেনসিল, বিভিন্ন মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট (বাঁশি, সেতার, ভায়োলিন) রাখতে পারেন। এতে করে সে একা থাকলেও ছবি আঁকার চেষ্টা করবে। মিউজিক বাজানোর চেষ্টা করবে।

আট. শিশুদের ঘরে অবশ্যই মিনি লাইব্রেরি তৈরি করা উচিত। অবসর সময়ে অভিভাবকের বই পড়ার অভ্যাস থাকলে সন্তানও তা রপ্ত করবে। আথবা খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস করুন, আপনাকে দেখেই তার মধ্যে এই অভ্যাসগুলো গড়ে উঠবে।

নয়. প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসুন। শিশুদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া খুব জরুরি। শিশুকে নিয়ে বাগানে বা প্রকৃতির মধ্যে খেলাধুলা করুন। লুকোচুরি খেলুন, ছোটাছুটি করুন, সময় কাটান তাতে শিশুরা সামাজিক হয়ে উঠতে পারবে। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারবে। যারা শহরে থাকেন, তারা সপ্তাহে এক দিন বা মাসে দুই দিন শিশুকে নিয়ে প্রকৃতির কাছে যেতে পারেন। এতে শিশুর মানসিক বিকাশের উন্নতি হবে।

দশ. শিশুদের ঘরের কাজে ব্যস্ত রাখতে পারেন। বিশেষ করে মায়েরা এ কাজটি করতে পারেন। আপনার সন্তানকে বলতে পারেন, আজকে তুমি আমাকে এ কাজে সহযোগিতা করো। এতে আপনার সন্তান ঘরের কাজের প্রতি আগ্রহী হবে এবং মোবাইল আসক্তি থেকে সরে আসবে।

-এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]