ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৪ অক্টোবর ২০২১ ৯ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ২৪ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

আমেরিকার দ্বৈতনীতি নতুন নয়
রণেশ মৈত্র
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৮:৫৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 78

বিশ্বব্যাপী প্রায় সব গণমাধ্যমে আফগানিস্তান নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হচ্ছে। কিন্তু একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে- এই পরিবর্তন আফগান নাগরিকদের মনে কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, তারা কী ভাবছেন, কী করছেন তা ওইসব গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ ওই দেশের জনগণই আসল শক্তি, আসল লাভবান অথবা আসল ক্ষতির সম্মুখীন।

মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। জন্ম সূত্রে প্রায় ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামেই বাস করেছি-প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে মাধ্যমিকে সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা দেওয়া পর্যন্ত গ্রামেই ছিলাম। তখন দেখেছি এক মস্তবড় কাপড়ের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে, হাতে লাঠি নিয়ে গ্রামে গ্রামে এক ধরনের অবাঙালি কারও কারও বাড়িতে যাচ্ছেন- দাবি করছেন তাদের দেওয়া ঋণের টাকা শোধ করতে। শ্বেতবর্ণ, দীর্ঘদেহ ওই মানুষগুলো আধো বাংলা, আধো ঊর্দুতে কথা বলতেন। টাকা না পেলে কোথাও কোথাও বলতে শুনেছি ‘আসলি নেহি তো সুদ দো’ যেন সুদের টাকাটাই তাদের মূল দাবি ঋণের আসল টাকা নয়।

পরে যখন শহরে এলাম স্থায়ীভাবে তখন পাবনা বাজারে দেখতাম বেশ কিছু সংখ্যক আফগানকে নৈশপ্রহরী হিসেবে বাজার এলাকা প্রহরা দিতে যতটুকু মনে পড়ে, তাদের হাতে কদাপি বন্দুক-রাইফেল দেখিনি- দেখেছি কাউকে কাউকে খালি হাতে ঘুরতে, কেউ বা হাতে লম্বা একটা লাঠি আবার কেউ বা ফালা হাতে নিয়ে বাজার পাহারা দিতেন। ওদের কাছে থাকত বিপদ সঙ্কেত জানানো বাঁশি বা হুইসেল ও টর্চলাইট। বেশ কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তারা পুরো বাজার এলাকা পাহারা দিতেন- রাতের বেলা পাহারা দানকালে কেউ কদাপি একা ঘুরতেন না। এভাবে গ্রামে যাদের ঋণের টাকাও সুদ আদায় করতে বা শহরে যাদের বাজার পাহারা দিতেন দেখতাম- তাদের আমরা কাবুলিওয়ালা বলে ডাকতাম বা জানতাম। জানতাম সাধারণ অর্থে সৎ ও সাহসী বলে। গ্রামে যারা ঘুরতেন তারা বছরের শীত ঋতুতে আসতেন অন্য সময় তাদের দেখা যেত না। শীত শেষে তারা চলে যেতেন তাদের নিজ দেশে- আবার ফিরতেন পরবর্তী শীতে। কিন্তু শহরে যারা থাকতেন তারা স্থায়ীভাবে থাকতেন তবে স্ত্রী-পুত্র-পরিজন নিয়ে থাকতেন এমন কথা শুনিনি। অথবা এদের কোনো দুর্নামও কারও মুখে শুনিনি; বরং এদের সাহস ও সততা ছিল সর্বজনস্বীকৃত।

অষ্টম শ্রেণিতে পাবনা শহরে এসে যখন ভর্তি হই, তার কিছুকাল পর থেকেই ভাষা আন্দোলনে যেমন অংশগ্রহণ করি, তারপর থেকেই রুশ বিপ্লবের প্রতি, সমাজতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা, শোষণমুক্তি, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতা ও সব প্রকাশ বৈষম্যের বিরোধিতার ও স্বদেশ চিন্তা স্থায়ীভাবে মাথায় বাসা বাঁধে। বস্তুত ১৯৫০ সালে শিখাসংঘ নামক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলে অসংখ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও প্রাথমিক স্তরে মার্কসবাদী বইপত্র পড়া ও রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং সুকান্তের কবিতা, গোপাল হালদার ও অপরাপর মার্কসবাদী লেখকের লেখা গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও তাত্ত্বিক লেখা প্রভৃতি পাঠের মাধ্যমে ওই চেতনা গড়ে ওঠে। ওই সময় থেকেই বিশেষ করে ১৯৫২ সালে ছাত্র ইউনিয়নের শাখা গঠন এবং তার কার্যকলাপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতিও আকৃষ্ট হই। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ব্রিটিশ, ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের গোটা বিশ্বের মানুষের শত্রু এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন প্রভৃতি সমাজতান্ত্রিক দেশ সারাবিশ্বের জনগণের মিত্র।

তাই পৃথিবীর যে দেশেই বিপ্লব ঘটেছে বা ঘটছে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন ভিয়েতনাম, কোরিয়া, আলজেরিয়া, কিউবা প্রভৃতি দেশের জনগণের প্রতি- তাদের বিপ্লবী যোদ্ধার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নানা সমাবেশ থেকে জানিয়েছি।

এবারে, ওই পটভূমিতে আসা যাক মূল আলোচ্য আফগানিস্তান প্রসঙ্গে। ওই দেশটির রাজনীতি-অর্থনীতি তেমন কিছু জানার সুযোগ ঘটেনি ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত। আরও বেশি কারণ দেশটি বহুলাংশে মৌলবাদ ঘেঁষা বলে পরিচিত থাকার কারণে। যেমন আগ্রহ অনুভব করিনি সৌদি আরব, কামাল আতাতুর্ক-পরবর্তী তুরস্ক, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতি। এরা সবাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুগত দেশ- সে কারণেই মূলত।

কিন্তু অন্ততপক্ষে আমার দৃষ্টিতে আফগানিস্তানের প্রতি আগ্রহ জন্মাল ওই দেশে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে। তখন জানা গেল, এই নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত আগে আফগানিস্তানে এক ধরনের মৌলবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং ওই সরকারের পেছনে প্রকাশ্য সমর্থন ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের। পাকিস্তান সরকারের সমর্থন ও ছিল তাদের প্রতি। সে সময় ভারতে মোটামুটি অসাম্প্রদায়িক ও সমাজতন্ত্রে সমর্থক এবং তৃতীয় বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জোটের অন্যতম নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকার ও আমেরিকা ও পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় ভারতসহ জোট নিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্বের জোটের কোনো প্রকার সমর্থন আফগান সরকারের প্রতি ছিল না। তবে অকুণ্ঠচিত্তে ভারতসহ তৃতীয় বিশ্বের জোট নিরপেক্ষ দেশগুলো অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল সোভিয়েত সমর্থিত নতুন আফগান সরকারের প্রতি। যদিও সোভিয়েত সমর্থিত ওই সরকারটি সে দেশের কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বস্তুত আজতক আফগানিস্তানে কখনও সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে সে দেশের গোপন বামপন্থি দল সামরিক বাহিনীর এক অংশের সমর্থনে অকস্মাৎ একটি প্রগতিশীল সরকার গঠন করলে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমগ্র সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব তার প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করে।

৯/১১-এর ঘটনা আমেরিকাসহ সারাবিশ্বে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তখন আমেরিকার সুউচ্চ টাওয়ার, বাজার-বিপণি, আবাসিক এলাকা আকস্মিক বোমা ও গোলাবর্ষণে মারাত্মকভাবে ধ্বংস করেছিল অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। এই ভয়াবহ হত্যালীলার পর মার্কিন সরকার এর জন্য ইসলামী জঙ্গিবাদীদের দায়ী বলে ঘোষণা করেছিল। তখন থেকে মার্কিন সরকার ওই মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছিল।

কিন্তু যেই মাত্র আফগানিস্তানে সোভিয়েত সমর্থিত প্রগতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো, মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে আফগানিস্তান ও তার পাশর্^বর্তী এলাকায় অবস্থিত পাকিস্তানে তালেবানদের সমর্থকরাই না- রুশ সমর্থিত আফগান সরকারকে উৎখাতের জন্য তাদের উৎসাহিত করে তোলে। সিআইএ, আইএসআই প্রভৃতি অস্বাভাবিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করে ওই সরকার যেন তেন প্রকারে উৎখাতের। সে কারণে তারা ইসলামী মৌলবাদীদের দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে এবং তাদের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অর্থ, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয় তালেবানদের।

রুশ-সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তানে নারীদের মুখ, চুলসহ সম্পূর্ণ দেহ ঢাকা বোরখা পরা বাধ্যতামূলক ছিল। মেয়েদের বয়স ১০ বছরের বেশি হলেই স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। শরিয়া আইনের নামে তারা চালু করেছিল দোবরা ও পাথর ছুড়ে হত্যার মতো ভয়ঙ্কর শাস্তি।

অন্যদিকে সোভিয়েত সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মেয়েদের সব বৈষম্যমূলক বন্ধন থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তাদের জন্য উচ্চতম শিক্ষাগ্রহণ ও চাকরিসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে নারী সমাজকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। নতুন নতুন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয় এবং ওই সরকার তাবৎ জনহিতকর কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রগতিমনা ও শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে।

আফগানিস্তানের জনগোষ্ঠী বিপুল সংখ্যায় মুসলিম। তাদের এতকাল শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল- আধুনিকতার কোনো ছোঁয়াও সে দেশের মানুষকে স্পর্শ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাই অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত আফগান মুসলিমদের ধর্মের নামে উসকে তোলা সিআইএ ও আইএসআই এবং তালেবানদের জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়ে। সোভিয়েত সমর্থিত সরকারকে নাস্তিক ও ইসলামবিরোধী সরকার বলে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে হিংস্রতার মুখে ঠেলে দেওয়ার সহজ হয়ে পড়ে। দেশের গণতন্ত্রী, আধুনিক উদারপন্থি ও প্রগতিশীল আফগানরা হয়ে পড়েন মারাত্মকভাবে সংখ্যালঘিষ্ঠ।

একের পর সন্ত্রাসী আঘাত হানা হতে থাকে রুশ সমর্থিত সরকার তার মন্ত্রী ও আমলাদের বিরুদ্ধে। অবরোধমুক্ত মেয়েদের নানা অপবাদের মাধ্যমে হতাশাগ্রস্ত করে তোলা হয়। গোটা জাতি হয়ে পড়েন নিস্পৃহ, নিষ্ক্রিয় ও স্থবির। এই পরিস্থিতি এবং তা ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলো জনতার মধ্যে তেমন ঠাঁই করে নিতে না পারা এবং কার্যত জনসমর্থিত কোনো রাজনৈতিক দল না গড়ে ওঠায় তার সুযোগ নিয়ে এবং মার্কিন ও পাকিস্তানি সহযোগিতার কারণে তালেবানরা সোভিয়েত সমর্থিত সরকারকে উৎখাত করতে সমর্থন হয়। পুনরায় চালু হয় প্রতিক্রিয়াশীল জঙ্গি শাসন। ১/১১-এর ঘটনার মাধ্যমে আমেরিকা ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যতটাই ইসলামী জঙ্গিবাদের বিরোধী হয়ে উঠেছিল, আফগানিস্তানে রুশ সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ততোধিক ওই জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে পড়ে।

সেই পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমেই রুশপন্থি সরকার উৎখাত করে আফগানিস্তানে তারা মার্কিন সমর্থক তাদের সরকার গঠন করে। অস্ত্রের জোরে এই সরকার ২০টি বছর ওই দেশে আমেরিকার তাঁবেদার একটি পুতুল সরকার দিয়ে দেশ পরিচালনা করে। এই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থানের উগ্রপন্থি তালেবানদের তারা তাঁবেদার আশরাফ ঘনির সরকারকে উৎখাত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এই তালেবানরা আফিম পাচার, কালো টাকা ও নানা অসৎ পথে এবং দেশ-বিদেশের নানা সূত্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিকানা অর্জন করে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, আমেরিকাও তাদের অস্ত্র সজ্জিত করে অর্থ সঙ্কুলান করে। এই দ্বৈতনীতি আমেরিকার জন্য নতুন নয়।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]