ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৩ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

যে জীবন শুধুই কষ্টের
অরূপ তালুকদার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১০:১৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 95

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের দেশের খেটে খাওয়া কোটি সাধারণ মানুষের স্বস্তি এবং শান্তি সহজেই ফিরে আসবে না। কারণ একটার পর একটা দুর্ভোগ তাদের সারাক্ষণই তাড়া করে বেড়ায়। এখন করোনা বেশ কিছুটা সহনশীল পর্যায়ে গেলেও মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে অন্যদিকে। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের জীবনের দুঃখ কষ্টের ভাগীদার আসলে কেউই হতে চায় না। বাস্তব সত্য এটাই। জীবনযাপনের গ্লানি নিয়ে তাদের আজীবন পথচলা কোনো দিন শেষ হবে না।

এখন দেশে ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কমে এসেছে। এটা আমাদের সবার জন্য স্বস্তির সন্দেহ নাই। যদিও বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞরা এখনও মনে করেন, যখন-তখন এই ভাইরাসের সংক্রমণ আবার শুরু হয়ে যেতে পারে এবং সেটা এর চেয়েও আরও ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিতে পারে সেই আতঙ্ক থেকেই যাচ্ছে।

কিন্তু উন্নত বিশ্বের মানুষ এসব ধ্যান-ধারণার তোয়াক্কা করে বলে মনে হয় না। কারণ সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হওয়ার পর থেকেই তারা তাদের নিজস্ব জীবনের ছন্দে আবার ফিরে গেছে বলেই মনে হয়। আমরাও যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাদের সেই পুরনো জীবন ধারায় ফিরে যাওয়া কি এতই সহজ হবে আমাদের জন্য? এ এক কঠিন প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া আরও কঠিন। কারণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষ পারস্পরিকভাবে যতটা সহনশীল এবং একজন অন্যজনের জন্য যতটা সমব্যথী, একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে আমরা যেন ততটা নই। এই প্রবণতা এক দিনে গড়ে ওঠেনি, বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছে করোনা। পরে আমাদের দেশের কিছু সুযোগ সন্ধানী নব্য ধনী ব্যবসায়ী এবং অবৈধভাবে কালো টাকা অর্জনকারী দলীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এই সুযোগটা নিয়ে সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা দিনের পর দিন বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের স্বার্থ এবং নির্মমতার কাছে হেরে গেছে মানবতা।

বলতে বাধা নেই, আমরা একসময় যে মন-মানসিকতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছিলাম সেই চিন্তাটা এখন অনেকের মধ্যেই আর কাজ করে না কারণ তার থেকে এখন তারা অনেক দূরে সরে গেছে, হয়তো ব্যক্তিগত স্বার্থের চাপে সেসব চিন্তা মন থেকে একেবারেই ঝেড়ে ফেলেছে। না হলে বিশেষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর থেকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা এমন হওয়ার কথা নয়। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতোই হওয়ার কথা ছিল। স্বাধীনতার পরেও আমরা দেখেছি বেশ কিছু বিদেশি মানুষকে আমাদের দেশে এসে কাজ করতে ও সেসব দেশে আমাদের দেশের মানুষরা এখন কাজের সন্ধানে যায়। সামগ্রিক পরিস্থিতি ও পার্থক্যটা বুঝতে এখন রকেট সাইন্স পড়তে হয় না।

স্বাধীনতার পর থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করে একটি আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী মানুষ যেকোনোভাবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ফলে আমরা পেয়েছি অসংখ্য তথাকথিত ব্যবসায়ীদের গ্রুপ। যাদের না ছিল শিল্প গড়ে তোলার পূর্ব অভিজ্ঞতা বা তেমন মন মানসিকতা বরং তারা দিনের-পর-দিন ব্যাংকের কাছ থেকে নানা কৌশল এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়ে ঋণখেলাপি হয়েছেন। শিল্প গড়ে তোলার নামে জমি এবং ব্যাংকের টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছেন। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপারটি হচ্ছে তাদের হাত এখন এতটাই লম্বা, দেশের আইন তাদের সহজে ছুঁতে পারে না। বলা বাহুল্য, দেশ ও দশের চিরদিনের শত্রু এরাই।

গত সপ্তাহে আমাদের দেশে বিশেষ করে করোনাকালীন নানা নামে গজিয়ে ওঠা ই-কমার্স প্লাটফর্মে যে ভয়ঙ্কর প্রতারণা বাণিজ্য চলছে তার কথা বলেছিলাম। কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের সহজে হুঁশ ফেরে না। বরং নানা সময়ে নানা নামে গজিয়ে ওঠা ভুঁইফোড় কোম্পানিগুলোর প্ররোচনা ও প্রলোভনে পড়ে বারবার তাদের সঞ্চিত অর্থ খুইয়েছে। এটা আমাদের কাছে এখন আর নতুন কিছু নয়, এখনও আমাদের জানার বাইরে লোভের বশবর্তী হয়ে এমন ধরনের ধান্দাবাজ প্রতারকদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বসে আছে হাজার হাজার অসহায় মানুষ।

স্মরণ করা যেতে পারে, কয়েক বছর আগে থেকে যে মিড লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম বাণিজ্যের মাধ্যমে ডেসটিনি-২০০০, যুবক, ইউনিপে টু ইউ ইত্যাদি এবং সাম্প্রতিকতম সময়ে এহসান গ্রুপসহ বিভিন্ন নামে যেসব ভুয়া প্রতিষ্ঠান লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে নানা রকম প্রলোভনের জালে জড়িয়ে তাদের সামান্য সঞ্চয় আত্মসাৎ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে তাদের দমন করা এখন রাষ্ট্রের জন্যই অবশ্য পালনীয় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেসটিনি, যুবক এবং ইভ্যালি বা ই-অরেঞ্জসহ কিছু কিছু এমএলএম বা ই-কমার্স প্লাটফর্মে গত কয়েক বছরে গজিয়ে ওঠা কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিলেও তাতে ভুক্তভোগীদের খুব কিছু কি উপকার হয়েছে? তারা সবাই কি অর্থ ফেরত পেয়েছেন? মনে হয় না।

গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় প্রতারণা এবং সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তথাকথিত এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগিব আহসান এবং তার ভাইদের গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, রাগিব আহসান মূলত মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে শরিয়াসম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগের কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতেন। তিনি ১১০ কোটি টাকা মূলধন ও ১০ হাজার সদস্য নিয়ে তার ‘এহসান গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠা করলেও তার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা। মাত্র ৪১ বছর বয়সেই তিনি নিজের এবং স্বজনদের নামে ১৭টি ব্যবসা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দিনের পর দিন নানা ধরনের প্রলোভনের মাধ্যমে লক্ষাধিক সরল প্রাণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কমপক্ষে ১৭ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ করা প্রয়োজন, করোনা পরবর্তীকালে সাধারণ মানুষদের বলা যায় প্রায় জিম্মি করেই এই ধরনের লোক ঠকানো ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে কিছু ভালো মানুষের মুখোশধারী মানুষ সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই।

এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষদের জন্য ঠিক এই সময় আর যে বড় সমস্যাটি দেখা দিয়েছে সেটি হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি। নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশের কোটি কোটি স্বল্প আয়ের নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ। প্রতিদিনের খেটে খাওয়া শ্রমিকদের কষ্ট এবং দুঃখের কারণ হয়ে উঠেছে কতিপয় বড় বড় অসৎ তথা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এদের কাছে নিজের স্বার্থ ছাড়া কোনো কিছুই বড় নয়। এদের কাছেই এখন জিম্মি হয়ে পড়েছে যেন এ দেশের অসহায় সাধারণ মানুষ।

আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত আর তার জন্য প্রয়োজন চাল ও তারপরে তেল নুন ডাল ইত্যাদি। অসাধু ব্যবসায়ীরা এখন এসব কিছুই তাদের কব্জায় নিয়ে নিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে চালের দাম প্রতিকেজিতে বেড়েছে তিন থেকে চার টাকা। ফলে গরিব মানুষের খাদ্য যে চাল তাও এখন আর প্রতিকেজি ৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাবে না। তবে উচ্চবিত্তদের জন্য যে চিকন চাল তার মূল্য তেমন বাড়েনি। কয়েক সপ্তাহ আগের মতোই রয়ে গেছে। প্রতিকেজি মিনিকেট চাল পাওয়া যাচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় এবং নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৭২ টাকায়। এদিকে মোটা মসুর ডাল কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা।       
সবচেয়ে অবাক করা দাম বেড়েছে ভোজ্য তেল সয়াবিনের। বেশ কিছুদিন আগেও প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে, গত কয়েক মাসের মধ্যে তার দাম বেড়ে এখন প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৫৩ টাকায়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতি লিটারের দাম উঠে যাবে ২০০ টাকায়। এ ক্ষেত্রে আমদানিকারক, মজুদকারী এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের নানা টালবাহানার মধ্যে সবচেয়ে বড় অজুহাত হচ্ছে সরবরাহ ঘাটতি এবং বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি। এই ধরনের অজুহাত কখনও বন্ধ হয় না।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবণতা শুধু যে চাল-ডাল তেলের ক্ষেত্রেই বেড়েছে তা নয়, বেড়েছে আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের ক্ষেত্রেই ও মাছ মাংস শাকসবজি সবকিছুর দাম চড়া ও নানা অজুহাতে বিক্রেতারা এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়েই চলেছে লাগামহীনভাবে। কারণ বাজার মনিটরিং তেমনভাবে নিয়মিত পরিচালিত হয় না।

আমরা এখন সবাই জানি, দেড় বছরেরও অধিক সময় ধরে করোনা মহামারির কারণে সাধারণ মানুষের নিয়মিত আয় উপার্জন কমে গেছে। কিন্তু তাতে কী হবে? এর মধ্যেও আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমনÑ মাছ, মাংস, শাকসবজি ইত্যাদির মূল্য বেড়েই চলেছে। স্বল্প আয়ের পরিবার, যাদের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির চাকরি চলে গেছে করোনার কারণে কিংবা কোনো দিনমজুর বা শ্রমিক কাজের অভাবে দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করতে পারছে না, তার কী হবে? সবাই কি সামান্য হলেও সরকারি প্রণোদনা পেয়েছে? সে তার পরিবার নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর কি এখন সহজে কেউ দিতে পারে?

অথচ অবাক ঘটনা, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও হাজার হাজার ছোটখাটো ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা করোনাকালীন লকডাউনের কবলে পড়ে হয় সর্বস্ব খুইয়েছেন
অথবা কোনোরকমে টিকে আছেন। এসব প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে কর্মরত হাজার হাজার লোক চাকরি হারিয়েছেন। তারা এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত ও তাদের সমস্যা মিটবে কেমন করে? কিন্তু এর মধ্যেও এই করোনা চলাকালীন আমাদের দেশে এক হাজারেরও বেশি কোটিপতি বেড়েছে, ভাবা যায়! করপোরেট কালচার এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির কবলে পড়ে আমাদের মতো দেশের সাধারণ মানুষের শুধু খেয়েপরে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম আর কষ্টের জীবন কোনো দিন কি শেষ হবে?

লেখক : শব্দসৈনিক ও কথাসাহিত্যিক

/জেডও/




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]