ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৩ আশ্বিন ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

বুলবুল চৌধুরী : মহাকালের হীরকদ্যুতি
কুশল ভৌমিক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৪:১৭ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 169

বুলবুল চৌধুরী একজন বর্ণিল, নিভৃতচারী বিরল প্রতিভাধর কথাশিল্পী। তার গল্প বলার ধরন ছিল স্বতন্ত্র। অধিকাংশই গ্রামীণ পটভূমি, যদিও পটভূমির ক্ষুদ্রতা ভেদ করে সেখানে উঁকি দিয়েছে জীবনের মহামহিরুহ। শিকড় সন্ধানী, মাটিগন্ধা এই লেখককে আমরা সম্প্রতি হারিয়েছি। দুরারোগ্য ক্যানসার তাকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তার সৃষ্টি অমরত্বের অমিয়ভাণ্ড হয়ে ঠাঁই নিয়েছে। নির্মম হলেই একথা সত্য আমরা হীরকদ্যুতির উজ্জ্বলতা নিয়ে তখনই কথা বলি যখন গোপন বৈভবের মতো সে আড়ালে লুকায় অর্থাৎ মহৎ সাহিত্য এবং মহান লেখকদের নিয়ে আমাদের যাবতীয় আয়োজন, প্রশংসা, স্তুতি, আলোচনা সবই যেন জমা থাকে মৃত্যুর জন্য। জীবিতকালেই বুলবুল চৌধুরী হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জসীমউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি এবং একুশে পদক লাভ করেছেন । কিন্তু সেই অর্থে তাকে নিয়ে সাহিত্যপাড়ায় হইচই হয়নি, মিডিয়ার কাভারেজ জুটেনি। তিনি ব্যাপক পঠিত হয়েছেন এ কথাও বলতে পারি না। এর প্রধান কারণ হলো- প্রচারসর্বস্ব ও মিডিয়ার আশীর্বাদপুষ্ট লেখক ও বুদ্ধিজীবীগণ এতটাই আত্মমগ্ন, বুলবুল চৌধুরীদের মতো লেখকদের পাঠ ও বিশ্লেষণের সময় তাদের হয়ে উঠেনি।  আর আত্মপ্রতারক বাঙালি পাঠক সমাজ যেহেতু বাহ্যিক চাকচিক্য ব্যতিরেকে কাউকে স্বর্ণখণ্ড বলে স্বীকারই করে না তারাও বেশিরভাগ বুলবুল চৌধুরীকে আবিষ্কার করার সময় ও সুযোগ পায়নি।

ফলে সাহিত্যের নিবিড় পাঠক ছাড়া অন্যদের কাছে তিনি দূরবর্তী রহস্য হয়েই থেকেছেন। অথচ বুলবুল চৌধুরীর লেখার ভেতর যতটুকু গল্প আছে তার চেয়ে ঢের বেশি আছে জীবন।

বুলবুল চৌধুরীর জন্ম গাজীপুর জেলার দক্ষিণবাগ গ্রামে ১৬ আগস্ট ১৯৪৮ সালে। জন্ম গাজীপুর হলেও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। ভাওয়াল গড়ের মাটির গন্ধ, খাল বিল জলাশয়ে নতুন জলের সঙ্গে ভেসে আসা মাছ আর অসংখ্য জলচর পাখি, আদিগন্ত ফসলের মাঠে ঘর্মাক্ত কৃষক আবার শৈশব-কৈশোরের মায়াবী আলোয় দেখা পুরান ঢাকা কোনো কিছুই তার চোখের আড়াল হয়নি। অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নিয়ে তিনি লিখে গেছেন একের পর এক গল্প, উপন্যাস। তার গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো আমাদের অচেনা নয় বরং ভীষণ পরিচিত আপন মানুষ। আমাদের চারপাশে নিয়ত ঘোরাঘুরি করা এসব জীবন বুলবুল চৌধুরী অবলোকন করেছেন গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে। নেপথ্যে দাঁড়িয়ে তিনি এদের নির্মাণ করেছেন ভেঙেছেন গড়েছেন ধ্যানমগ্ন শিল্পীর মতো, আর নিজে থেকে তৃতীয় পুরুষ হয়ে গল্পের আড়ালে জীবন্ত গল্প হয়ে। বুলবুল চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার এক অসাধারণ স্মৃতিচারণ করেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল। তিনি লিখেছেন একবার ছবি আঁকার কাজে কমলাপুর রেলস্টেশন গিয়ে ফেরার সময় তিনি দেখতে পান বুলবুল চৌধুরী একটা চাদর জড়িয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছেন। কী করছেন জিজ্ঞেস করতেই তার উত্তর ছিল- ‘মানুষ দেখছি।’ এই মানুষ দেখাটা একজন কবি বা সাহিত্যিকের জন্য যে কত বড় কাজ এ কথা এ যুগের বেশিরভাগ লেখকই জানেন না কিংবা মানুষ দেখার এই ক্ষমতাটিই অনেকের নেই। তিনি মানুষ দেখতেন জীবন দেখতেন, মানুষ লিখতেন, জীবন লিখতেন।

প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘টুকা কাহিনী’ প্রকাশের পরই তিনি তুমুল আলোচনায় আসেন। এরপর প্রকাশ হয়েছে গল্পগ্রন্থ- পরমানুষ, মাছের রাত, চৈতার বউ গো ইত্যাদি। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে- অপরূপ বিল ঝিল নদী, তিয়াসের লেখন, অচিনে আঁচড়ি, মরম বাখানি, এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে, ইতু বৌদির ঘর ইত্যাদি। এ ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে আত্মজৈবনিক গ্রন্থ-জীবনের আঁকিবুঁকি, অতলের কথকতা। বুলবুল চৌধুরী গ্রামীণ জীবনকে নানা আঙিকে উপস্থাপন করেছেন। নগরায়ণের জটিল জীবনচক্রও তার লেখায় উপেক্ষিত থাকেনি। ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগা দুটি রচনা দিয়ে এই নিবন্ধ শেষ করব। একটি গল্প- ‘পরমানুষ’, অন্যটি উপন্যাস  ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’।

‘পরমানুষ’ গল্পটিতে কথাকার বুলবুল চৌধুরী অসামান্য দক্ষতায় উপস্থাপন করেছেন তথাকথিত নিচুতলার মানুষদের মনস্তত্ত্ব। কইতরী এই গল্পের মুখ্য চরিত্র। সে ধনীখোলা হাটের নটীবাড়ির নটী। কইতরীর প্রতি গ্রামের যুবক আরমানের দুর্নিবার আকর্ষণ। একদিন পকেট থেকে সযতনে রাখা ঘড়িটা বের করে সে কইতরীর হাতে গুজে দেয়। কইতরী উচ্চস্বরে ‘না’ বলে। আরমান আবেগমাখা কণ্ঠে বলে- ‘আমারে তুমি পর ভাবতে পার কিন্তু আমি তোমারে আপন করেই নিছি।’ কইতরী চিৎকার করে বলে ‘আমারে ঘড়ি পিন্দানের কেডা তুমি?’

ঘড়িটা ছুড়ে ফেলে দরজায় খিল খুলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কইতরী এগিয়ে এসে দুহাত জড়িয়ে ধরে বলে- ‘তুমি ক্যান বোজ না আমি পরমানুষ?’ গল্পের শেষটা ভীষণ করুণ। কইতরী এই ঘৃণার জীবন থেকে বাঁচার জন্য নদী সাঁতরে পালাতে চায়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না, পাইন্না হারামি তাকে ধরে ফেলে এবং বুকে ছুরি চালিয়ে হত্যা করে।

‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’ উপন্যাসে একজন নারীর বয়ানে ফুটে উঠেছে তার বেশ্যা হওয়ার করুণ কাহিনী। নিশিপুর রেলস্টেশন থেকে লক্ষ্মীকে কুড়িয়ে পায় স্কুলশিক্ষক হিতেশ আচার্য। স্ত্রী যশোদার কোলে বাচ্চাকে দিয়ে বলে- ‘তোমার আরেকটা মাইয়া।’ হিতেশ-যশোদার দুই কন্যা মিনতি দেবী এবং কৃত্তিকা দেবীর সাথে সুখে-দুঃখে আনন্দ-বেদনায় বড় হতে থাকে লক্ষ্মী। সময়ের পরিক্রমায় যৌবনবতী লক্ষ্মী অবচেতনে ভালোবেসে ফেলে হিতেশ আচার্যের পুত্র ধীমানকে। কিন্তু এ তো ঘোরতর অন্যায়, মহাপাপ।

এক মাতৃগর্ভে জন্ম না হলেও, এক পিতার ঔরশে জন্ম না হলেও সে তো হিতেশ-যশোদারই কন্যা, ধীমান ওর ভাই। অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন লক্ষ্মী এবং মা-বাবা ওকে বিয়ে দেয় ধনী ব্যবসায়ী বিভাসের সাথে। বিয়ের প্রথম রাতের মোহভঙ্গ হয় লক্ষ্মীর, তার স্বামীটি যে কেবল নেশাখোর তাই-ই নয় সে পুরুষত্বহীন, লক্ষ্মীকে মাধুরীর রসে স্নাত করার কোনো ক্ষমতাই যে ওর নেই। লক্ষ্মীর জীবনের প্রতিটি রাত দুর্বিষহ অভিশাপ হয়ে আসে। একদিন ওখানে বেড়াতে আসেন শ^শুরের বন্ধু গৌর কিশোর মশাই, বয়স হলেও সুঠাম দেহে বেশ আকর্ষণীয় অবয়ব। সবার কাছে পূজনীয় হলেও লক্ষ্মীর দিকে তার ভোগের নজর।  একপর্যায়ে কামনার স্রোত পরাজিত করে লক্ষ্মীকে, গৌর কিশোরের লাম্পট্য এবং যৌনইশারা জয় লাভ করে। বাড়ির লোকের কাছে ধরা পড়ে লক্ষ্মীর এই স্খলন। স্বামী কর্তৃক বিতারিত, পরিত্যাজ্য লক্ষীর ঠাঁই হয় বেশ্যাপল্লীতে।

এ রকম অসংখ্য জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের জনক বুলবুল চৌধুরী। তিনি জীবনকে দেখেছেন নিবিড় পর্যবেক্ষণে, নিংড়ে তুলে এনেছেন লুকায়িত বোধ ও যাপনের অপূর্ব সম্ভার। তিনি জীবনকে এঁকেছেন সবটুকু অকৃত্রিমতা দিয়ে। গ্রামীণ জীবন ও দৃশ্যের বর্ণনায় তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

বাংলা সাহিত্যের এক সত্যিকারের হীরকদ্যুতি বুলবুল চৌধুরী যদিও কাচের আস্ফালনে কিছুটা আড়ালেই ছিলেন আমৃত্যু। কিন্তু সময় হলো শ্রেষ্ঠ বিচারক, মহাকাল কখনই তার লুকায়িত সম্পদ চিনতে ভুল করেনি, করে না।

/জেডও/




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]