ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৪ অক্টোবর ২০২১ ৯ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ২৪ অক্টোবর ২০২১
http://www.shomoyeralo.com/ad/amg-728x90.jpg

জাদুময় জাদুঘরে
ফারুক মঈনউদ্দীন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৪:৩৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 317

ডেট্রয়েট ইনস্টিটিউট অব আর্টের (ডিআইএ) শতাব্দীপ্রাচীন ভবনটার সামনে যখন পৌঁছাই তখনও জানতাম না ২ হাজার কোটি ডলারের ঋণভারে জর্জরিত নগর সরকার নিজেদের দেউলিয়াত্ব জায়েজ করার জন্য আদালতে ধরনা দিয়েছেন। আমেরিকার দেউলিয়া শহরগুলোর মধ্যে ডেট্রয়েটের জনসংখ্যা ১৯৫০ সালে ছিল ১৮ লাখ, ৬০ বছর পর এই সংখ্যা নেমে আসে ৭ লাখে। হাজার হাজার পরিত্যক্ত ভবন ও জমি নিয়ে শহরটির প্রাচীন এলাকায় এখনও দেখা যায় ভুতুড়ে বাড়িঘর। জনসংখ্যা হ্রাসের মূল কারণ এখান থেকে গাড়ির কারখানাগুলোর স্থানান্তর এবং শে^তাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার দাঙ্গা। 

নগরীটির দেউলিয়া হওয়ার প্রধান বলি হিসেবে এটির দুর্মূল্য চিত্রকলা ও ভাস্কর্যগুলো চলে যেতে বসেছিল নিলাম ঘরে। ডিআইয়ের পরিচালকদের কেউ দামি শিল্পকর্মগুলোর একটা অংশ নিলামে তুলে অর্থ সংস্থানের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। অবশেষে ভ্যান গঘ, পিকাসো, আঁরি মাতিসের মতো ওস্তাদ শিল্পীদের অমূল্য শিল্পকর্মসমৃদ্ধ জাদুঘরটি রক্ষায় এগিয়ে আসেন শিল্পপ্রেমী মানুষেরা। তাদের মিলিত উদ্যোগে বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের অনুদান, ব্যক্তিগত চাঁদা এবং রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা মিলিয়ে ৮০ কোটি ডলার জোগাড় হয় বটে, কিন্তু ৪০০ কোটি ডলারের সম্পদসমৃদ্ধ জাদুঘরটির মালিকানা চলে যায় একটা স্বায়ত্তশাসিত দাতব্য সংস্থার কাছে।

ঐতিহাসিক এই জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৮৮৮ সালে। তখনও এটির নিজস্ব কোনো শিল্পকর্ম ছিল না, বিভিন্ন সংগ্রাহকের কাছ থেকে ধার করে এনে সাজাতে হয়েছিল প্রদর্শনী। আড়াই মাস ধরে চলা সেই প্রদর্শনীটি দেখেছেন সর্বমোট ২৫ হাজার দর্শক। দর্শনী বাবদ আয় এবং ব্যয়ের হিসাব করার পর দেখা যায় জাদুঘরের নিট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৮৪২ ডলার। আসলে যাত্রা শুরুর পরপরই হুমকির মুখে পড়েছিল জাদুঘরটির অস্তিত্ব। 
ডিআইএর সামনে মিষ্টি রোদের সকাল তখন দুপুরের দিকে গড়াচ্ছিল। শখানেক গ্যালারিতে প্রায় ৬৫ হাজার শিল্পকর্মের সংগ্রহ নিয়ে আমেরিকার শীর্ষ পাঁচটি আর্ট মিউজিয়ামের অন্যতমটি ভালোভাবে দেখতে কতদিন লাগবে বুঝতে পারি না। 

তাই বৈচিত্র্যের আকর্ষণে প্রথমে আফ্রিকান গ্যালারিতেই যাই। এখানে ছিল আফ্রিকার প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন ও ভাস্কর্য। শবযাত্রা এবং শেষকৃত্যের সময় বাজানো উনিশ শতকের ঢোলকের গায়ে আঁকা ছাগল, পাখি, সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদির মোটিফ থেকে প্রাণিজগতের আফ্রিকার প্রতি মানুষের সহজাত সম্পর্কের সঙ্গে কি এক অজ্ঞাত কারণে একাত্মতা বোধ করি। 

মিসরীয় সভ্যতার নিদর্শনসমৃদ্ধ গ্যালারিতে প্রথমবারের মতো মমি দেখে এক বিচিত্র অনুভূতি হয়। জারক দিয়ে সংরক্ষিত আড়াই হাজার বছরের পুরনো মানবদেহ দেখে এক ধরনের ভয় আর বিবমিষা জেগে ওঠে। প্যাঁচানো কাপড়ের ওপর হাসপাতালে আহত মানুষের শরীর ঢাকা চাদরে শুকনো রক্তের ছোপের মতো দাগ হাজার বছরের প্রাচীন শুষ্ক মরদেহে এনে দিয়েছে এক বিষণ্ন ছায়া। শেয়ালের মাথাওয়ালা এক অচেনা দেবতার মূর্তি দেখে গণেশের মূর্তির কথা মনে পড়ে যায়। 

গ্রিক গ্যালারিতে হেলেনিস্টিক সময়ের (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ থেকে ৩১ পর্যন্ত) ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে একটা মিথুন মূর্তি রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসপ্রাপ্ত পম্পেইর উদ্ধারকৃত নিদর্শন কিংবা ভারতের কোনারক মন্দিরের মিথুন মূর্তিগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর হরিণের একটা ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য দেখে মনে পড়ে পিকাসোর গর্ভিনী ছাগির ভাস্কর্যটার কথা। পেইন্টিং ও মৃৎশিল্পের নিদর্শনসমৃদ্ধ গ্যালারিটির পর রোমান গ্যালারিতে দেখা মেলে চতুর্থ শতাব্দীর রঙিন পাথর ও কাচের চমৎকার মোজাইকের নিদর্শন। 

ইউরোপীয় চিত্রকলার গ্যালারিতে দেখা মেলে ওস্তাদ শিল্পীদের কিছু কাজ। পিকাসোর ‘আসিজ ফাম’ (বিষণ্ন নারী), রেনোয়ার ‘দ্য হোয়াইট পিয়েরো’, ক্লদ মনের ‘গ্ল্যাডিওলা’ ছাড়াও রয়েছে এদগার দেগার ‘ভায়োলিনিস্ট অ্যান্ড ইয়ং উওম্যান’, পল সেজানের ‘বেদার্স (স্নানার্থীরা)’, ভ্যান গঘের ‘সেল্ফ পোর্ট্রটে উইথ স্ট্র হ্যাট’ ও ‘পোর্ট্রটে অব দ্য পোস্টম্যান জোসেফ রোঁলা’, পল গগ্যাঁর ‘পোর্ট্রটে অব দ্য আর্টিস্ট উইথ আইডল’ এবং আলফ্রেড সিসলি, হেনরি গেরভেঁ, থমাস করচার, থিওডর রুশোর পেইন্টিং। এগুলোর প্রায় অধিকাংশ ছবি বইপত্রে দেখা বলে মূল ছবির সামনে দাঁড়িয়ে একটা বিমূঢ় অভিজ্ঞতা হয়। 

আমেরিকার সমকালীন চিত্রকলার গ্যালারিতে মৃৎশিল্প, সিরামিক, ভাস্কর্য, ট্যাপেস্ট্রি, ফ্রেসকোর বহু কাজ দেখার পর ‘দ্য অটোবায়োগ্রাফি’ নামে হাওয়ার্ডেনা পিনডেলের (১৯৪৩) একটা ছবি খুব নজর কাড়ে। বিশাল ক্যানভাসের ওপর বিশ্ব মানচিত্রের মধ্যে বিভিন্ন মহাদেশের মোটিফে অ্যাক্রিলিক, টেম্পেরা, তেল রঙ, রক্ত, পলিমার, ফটো ট্রান্সফার আর ভিনাইলের মিশ্র মাধ্যমে ছবিটা এক উচ্চকিত প্রতিবাদের মতো উৎকীর্ণ। ক্যানভাস জুড়ে বিভিন্নভাবে লেখা ‘হাউ ডেয়ার ইউ কোয়েশ্চেন’, ‘বিউরিয়াল অ্যালাইভ,’ ‘অ্যাসাসিনেশন’, ‘ইন্টারোগেশন’, ‘টর্চার’, ‘রামাল্লাাহ’, ‘চিপ লেবার’, ‘সেন্সরশিপ’, ‘ব্যানড ফিউনারেল’, ‘ডিপোর্টেশন’ শব্দগুলো। 

মার্কিন চিত্রশিল্পীদের সম্পর্কে সামান্য তাচ্ছিল্যের ভাব থাকলেও এই শিল্পীর কাজটা দেখে সমীহ জাগে, যদিও শিল্পীর প্রতিবাদটা খুব উচ্চকিত মনে হয়। সেøাগান বনাম শিল্প-সাহিত্য নিয়ে যে বিতর্ক আছে, এটা যেন তারই একটা দৃষ্টান্ত।

ডিআইএ থেকে বের হয়ে একটা মোড় পেরোলেই ডেট্রয়েট হিস্ট্রিক্যাল মিউজিয়াম। দ্বাররক্ষীর কাছ থেকে জানা গেল, এখানে ক্যামেরা ব্যবহার জায়েজ। ঢুকতেই সামনে বদ্ধ কাচের দরজার ভেতর গায়ে সাদা চাদর-ঢাকা এক লোক মুখে ফেনাসহ চেয়ারের ওপর আধশোয়া, তার পাশে খেউরি করার জন্য ক্ষুর হাতে উদ্যত নরসুন্দর। দৃশ্যটা দেখে থমকে যেতে হয়। জাদুঘরের মধ্যে নাপিতের দোকান! কাছে যাওয়ার পর বুঝতে পারি, ওগুলো জীবন্ত মানুষ নয়, মনুষ্যমূর্তি। 

ডেট্রয়েটের প্রাচীন চেহারা বোঝানোর জন্য ইতিহাস থেকে তুলে এনে শহরের ছোট্ট একফালি অংশ জাদুঘরটির ভেতর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে যেন। নরসুন্দরের দোকান ছাড়াও রয়েছে ডাক্তারখানা, দন্ত চিকিৎসক, কামারশালা, বাণিজ্যিক অফিস ইত্যাদি। দোকানের দেয়ালের গায়ে সাঁটা রয়েছে পুরনো হ্যান্ডবিল, পোস্টার ইত্যাদি। ইতিহাসের প্রাচীনতম অধ্যায়টিতে ইট বিছানো রাস্তা, মøান আলোর গ্যাসবাতি, বড় গাছের ছায়াঢাকা আলো-আঁধারিতে গা ছমছম করা পরিবেশ। সম্পূর্ণ একা অবস্থায় ভয় ভয় লাগে, মনে হয়, যেকোনো মুহূর্তে আচমকা কোনো ছিনতাইকারী লাফ দিয়ে সামনে এসে পড়বে। পরিবেশটা জাদুঘরেরই অংশ জানা থাকা সত্ত্বেও মন থেকে ভয় দূর হয় না।  

একটা ছোট ঘরে টেলিগ্রাফের সাদামাটা যন্ত্রটা টরেটক্কা করে যাচ্ছিল। ট্রেনের হুইসেল এবং খটাং খটাং করে ট্রেন চলে যাওয়ার শব্দ শুনে বুঝতে পারি, ওটা স্টেশন মাস্টারের ঘর। চেয়ারের পেছনে ঝোলানো রয়েছে তার জীর্ণ কালো কোট। কিছুক্ষণ পর ফিরে গিয়েও গায়েবি স্টেশন মাস্টারটিকে চেয়ারে পাওয়া যায় না, বুঝতে পারি, কোনো স্টেশন মাস্টার আদৌ ওখানে বসেন না। 

সেদিন ছুটির দিন নয় বলে পুরো জাদুঘরে কয়েকজন অলস দর্শনার্থী আর আমি ছাড়া কেউ নেই। তখনও জানতাম না, অমূল্য শিল্পকর্মগুলোকে নিলামে তোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাই হয়তো হাতেগোনা শিল্পানুরাগীদের কেউ এটিকে শেষ দেখা দেখতে এসেছিলেন। সেটা যে সফল হয়নি, সে কথা আগেই বলেছি।









সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]