
ব্যাকিং খাত, শেয়ারবাজার, লিজিং কোম্পানি কিংবা এমএলএম কোম্পানির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অর্থ লুটপাটের ঘটনা এর আগে অনেকগুলো ঘটেছে। হয়তো গোপনে এখনও এসব খাতে হচ্ছে লুটপাট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্সের নামে অর্থ লোপাটের ঘটনা দেশব্যাপী বেশ আলোচিত ও সমালোচিত। প্রায় ২০টির বেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান লুট করেছে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। নানা রকম ছাড় ও প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এসব অর্থ লুট করেছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর উদাসীনতার কারণেই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে সাধারণ মানুষের অর্থ লোপাটের সুযোগ পেয়েছে। আগে থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নজরদারি বাড়ালে এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে এই অর্থ লোপাট ঠেকানো যেত। একইসঙ্গে এর দায় এড়াতে পারেন না ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাব নেতারা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ই-ক্যাব সূত্রে জানা গেছে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ লোপাট করেছে ই-অরেঞ্জ নামের প্রতিষ্ঠানটি।
ই-অরেঞ্জের মালিকরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লুট করেছেন এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি। প্রতিষ্ঠানটি লুট করেছে এক হাজার কোটি টাকা। ধামাকা শপিং লুট করেছে ৭৫০ কোটি, সিরাজগঞ্জ শপ ৬০০ কোটি, ফাল্গুনী শপিং ৫০০ কোটি, আদিয়ান শপিং ৪৫০ কোটি, কিউ কম ২৫০ কোটি, এসসিপি শপিং ১৫০ কোটি, সুমন ডট কম ৫০ কোটি, সুপম প্রডাক্ট ৫০ কোটি, চলন্তিকা শপিং ৩১ কোটি, নিউ নাভানা ৩০ কোটি, রূপসা শপিং ডটকম ২০ কোটি, কিউ ওয়ার্ল্ড শপিং ১৫ কোটি এবং নিরাপদ ডটকম ৮ কোটি টাকা লুট করেছে। এ ছাড়া ছোট কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান লুট করেছে ১০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০টির বেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অর্থ লোপাট করেছে ৫ হাজার ৪০ কোটি টাকারও ওপরে।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ লোপাটের বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মেয়াজ্জেম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি মনে করি, এই অর্থ লোপাটের মূল দায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা এর অধীন কোনো সংস্থার অনুমতি নিয়ে। কোন প্রতিষ্ঠান কী ব্যবসা করার জন্য অনুমতি নিয়েছে এবং সে প্রতিষ্ঠান সে ব্যবসা ঠিকমতো করছে কি না, সেটি তদারক করার দায়িত্ব তো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। সেসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও এখানে দায় রয়েছে। আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ লেনেদের বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউর। সে প্রতিষ্ঠানই বা কী করেছে এতদিন। এর পর আমি দায়ী করব ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাব নেতাদের। কারণ এসব লুটপাট করা প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই ই-ক্যাবের সদস্য। এমনকি ই-ক্যাব ইভ্যালির মতো বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের এমডি রাসেলকে অ্যাওয়ার্ডও দিয়েছে। এরাই তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ লোপাটের সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে এখনও ই-কমার্স ব্যবসা নিয়ে স্বচ্ছ ধারণার অভাব আছে, প্রস্তুতির অভাব আছে, ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের সরকারি বিধি থাকার দরকার তার অভাব রয়েছে, মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। অথচ ই-কমার্স খাতের সামনে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠান ই-কমার্সের ব্যবসা করছে দাপটের সঙ্গে। সেসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলছে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত আমাদের দেশে ই-কমার্সের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা দরকার। এ ছাড়া ই-কমার্স যে চ্যালেঞ্জে পড়েছে তা মোকাবিলা করে একটি গাইডলাইন তৈরি দরকার। সেসঙ্গে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর অপারেশনাল স্ট্রাকচারও ঠিক করা দরকার। এ ছাড়া ক্রেতাদেরও এখানে সচেতন হওয়ার দরকার আছে।
ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহিদ তমাল এ বিষয়ে সময়ের আলোকে বলেন, বেশ কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অর্থ লোপাটের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আসলে এখানে অনেকেই ই-ক্যাবকে দায়ী করছে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এক্ষেত্রে ই-ক্যাবকে দায়ী করার কিছু নেই। ই-ক্যাব কিন্তু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে সদস্য পদ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া এটি একটি বাণিজ্যিক সংগঠন। কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থিক লেনদেন বা সে প্রতিষ্ঠান কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে সেটি মনিটরিংয়ের দায়িত্ব ই-ক্যাবের নয়। এ দায়িত্ব সরকারের। ই-ক্যাবকে এমন কোনো ক্ষমতাও দেওয়া হয়নি। তবে যেহেতু প্রতিষ্ঠানগুলো ই-ক্যাবের সদস্য, সেহেতু এর দায় কিছুটা আমাদের ঘাড়েও আসছে। সে জন্য আমরা অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্য পদ স্থগিত করছি। তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সদস্যপদ স্থায়ীভাবে বাতিলও করা হচ্ছে।
টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভবনা কতটুকু
এই যে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লুট করা হলো সাধারণ মানুষের, এই অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু। এ বিষয়ে কোম্পানি আইন নিয়ে কাজ করা ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম বলেন, আইনি দৃষ্টিতে দেখলে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের অর্থ ফেরত পাওয়া সময়ের ব্যাপার। তবে সরকার বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যদি বিকল্প কোনো উদ্যোগ নেয় তাহলে অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব। তবু সেটি হতে হবে আদালতের নির্দেশে।
তিনি বলেন, ইভ্যালির লেনদেন হয়েছে অনলাইনে। তাদের কাছ থেকে কারা কত টাকা নিয়েছে সেগুলো নিশ্চয়ই অনলাইন লেনদেনের হিসাবে ডকুমেন্ট রয়ে গেছে। মোটাদাগে আমরা ক্রিকেট বোর্ডে ইভ্যালিকে স্পন্সর হতে দেখেছি। সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাও টাকা নিয়েছে। গণমাধ্যমেও এর বিজ্ঞাপন প্রচার হয়েছে। এসব খাতে লেনদেনে অস্বাভাবিকতা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে এ ধরনের ডিটেইল তদন্ত করতে হলে সবার আগে ইভ্যালিতে একজন লিক্যুইডিটর নিয়োগ দিতে হবে। সেটি নিয়োগ দিতে পারেন একমাত্র আদালত। আদালত সেটি স্বেচ্ছায় করতে পারবে না। পাওনা উদ্ধার প্রক্রিয়ার উপায় হিসেবে ক্ষতিগ্রস্তরা আদালতে রিট করতে পারেন। তখন আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।